Image description

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের নানা উদ্যোগেও সংকটের সমাধান হয়নি। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পেয়ে ৫০ শতাংশ ট্রিপ কমিয়ে দিয়েছে অনেক দূরপাল্লার বাস-ট্রাক। অনেক পরিবহনের নির্ধারিত শিডিউল বাতিল করতে হচ্ছে। যেসব বাস মালিকদের নিজস্ব পাম্প নেই তারা বেশি বিপাকে। রাজধানীর প্রধান তিনটি টার্মিনাল ঘুরে এ চিত্র মিলেছে।

গত ৬ই মার্চ থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু হয় পাম্পগুলোতে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নিয়মানুযায়ী, লোকাল বাস ও পিকআপে দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল; দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকে দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল কেনার অনুমতি দেয়া হয়। তবে, বেঁধে দেয়া নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানিও পায়নি বলে অভিযোগ করেছে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তেল না পেয়ে বাধ্য হয়েই প্রায় ৫০ শতাংশ ট্রিপ কমিয়েছে অনেক পরিবহন।

১৫ই মার্চ সরকারের তরফে ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি ঠেকাতে ও সেচের ডিজেলের চাহিদা পূরণে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা তুলে নেয়া হয়। এরপরও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। মার্চ মাসে দেশের তেলবাহী ১৭টি জাহাজ আসার কথা থাকলেও গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯টি জাহাজ এসে পৌঁছেছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে ২রা মে একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেটি আটকা পড়েছে। আরব আমিরাত থেকেও এক লাখ অপরিশোধিত তেল নিয়ে ২১শে মার্চ দেশের উদ্দেশ্যে আরও একটি জাহাজ রওনা দেয়ার কথা থাকলেও সেটির শিডিউলও বাতিল করা হয়।

ঢাকার বড় তিনটি বাসস্ট্যান্ড মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গাবতলী। সারা দেশের দূরপাল্লার বাসগুলো এখান থেকে ছেড়ে যায়। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ঘুরে বাসের চালক, হেলপার ও কাউন্টার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখনো পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছে না বাসগুলো। যাত্রাপথের বেশির ভাগ পাম্পই পাচ্ছে বন্ধ। অথবা কিছু কিছু পাম্পে তেল দেয়া হলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন ধরে অপেক্ষা করতে হয় চালকদের। তারা বলছেন, অধিকাংশ বাসই ঢাকা থেকে তেল ভর্তি করে নিয়ে যায়। একই তেল দিয়ে ঢাকায় ফেরত আসার চেষ্টা করেন তারা। ফেরত এলেও তেল নিতে ঢাকার ভেতর কিংবা ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থিত পাম্পগুলোতে লাইন ধরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। ফলে যে শিডিউলে ফের ঢাকা ত্যাগ করা লাগতো ওই শিডিউলে ছাড়তে পারে না বাসগুলো। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে যাচ্ছে টিপ। তবে, কিছু কিছু পরিবহনের নিজস্ব তেলের পাম্প থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি।

গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের পলি পরিবহন ও ইউনিটি পরিবহনের মালিক ইকবাল মানবজমিনকে বলেন, আমার গতকালকে রুটিনে ১৩টি শিডিউল মিস হয়েছে তেলের অভাবে। এই ১৩টি ট্রিপে অন্তত ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ইনকাম হতো। অথচ কোনো পাম্পেই তেল পাইনি। ফলে বাসগুলো কাল ছাড়তে পারেনি। একজন বাসচালক ওইদিন অন্তত ৫০০০ টাকা করে পেতো। তারাও বেতন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বাস মালিক বলেন, ঈদের আগে আমি ৭ লাখ টাকার মতো ঋণ করেছি, ঈদে চালিয়ে বাস থেকে তিন লাখের মতো তুলতে পেরেছি। বাকি সবটাই তো লোকসান। এর মূল কারণ বাসগুলো চলতে পারছে না তেলের অভাবে।

ঢাকা-ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা রুটের ইমাম বাসের চালক মাসুদ বলেন, সারাদিন গাড়ি চালিয়ে লম্বা লাইন দিয়ে রাখতে হয় তেলের জন্য। রাতের বসে থাকা লাগে। রাস্তাঘাটে খেয়াল করলে দেখবেন, মানুষজন অনেক কষ্ট করছে, ঠিকমতো গাড়ি চলছে না। ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচলকারী বিলাস পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার সিয়াম জানান, তাদের বাস আগে এক ঘণ্টায় দুইটা ছাড়তো। এখন ঘণ্টায় একটি ছেড়ে যাচ্ছে।

এনা ট্রান্সপোর্ট-এর কাউন্টার থেকে আহাদ বলেন, আমাদের কাউন্টার থেকে আগে দিনে ১০টি বাস ছাড়লে এখন ছাড়া হচ্ছে ৫টি। আরও পাঁচটি কমে গেছে, তা ঈদের আগেই। সাধারণত ঢাকা থেকে বাসগুলোকে তেল ভর্তি করে দেয়া হয়। বাসগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার পর যদি তেল ফুরিয়ে যায়, নতুন নির্দেশনা হয়েছে যাতে তেল নিয়ে নেয় যাত্রা পথের যেকোনো পাম্প থেকে। পরে ঢাকায় এসে নতুন শিডিউলে যাত্রী লোড করার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ইউনাইটেড বাসের চালক মিলন বলেন, তেল নিতে নিতে অনেক সময় এমন হয়, আমাদের পেছনের বাসগুলো আমরা লাইনে বসে থাকতেই অনেক আগে ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দীর্ঘক্ষণ ধরে লাইনে বসে থাকতে হয়। নির্দিষ্ট শিডিউলে বাস যেতে পারছে না। ঢাকা-বগুড়া রুটের একতা বাসের সুপারভাইজার সুজন বলেন, আগে যদিও বাস পাম্পে এসে সরাসরি তেল নিয়ে যাওয়া যেতো, এখন তা করা যাচ্ছে না। আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করা লাগছে। তবে আমাদের শিডিউলের ক্ষতি হচ্ছে না, কারণ আমাদের অনেক গাড়ি আছে; একটা দেরি হলে অন্যটা ছাড়া হচ্ছে।

ওদিকে, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই তেলের অভাবে ভাড়া থাকলেও ছাড়ছেন না ট্রাক। কারও ট্রাক তেলশূন্য পড়ে আছে। কেউ সামান্য পরিমাণের তেল ট্রাকে রেখেছেন। ট্রাক চালকরা বলছেন, তারা ৫ থেকে ১০ লিটার তেল পান সর্বোচ্চ। সেটিও ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করে। অথচ, দূরে কোথাও দিয়ে ঢাকায় আসতে হলে ট্রাক ও পণ্যভেদে ৪০ থেকে ৭০ লিটার তেল প্রয়োজন। তারা বলছেন, এতো অল্প পরিমাণ তেল নিয়ে যাত্রা করলে ফিরে আসতে অনেকবার তেল কিনতে হয় তাদের। তাছাড়া, একবার কিনতেই অনেক সময় চলে যায়। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পণ্যবোঝাই ট্রাক পৌঁছাতে পারে না।