‘শিট, মামা শিট’– কয়েক যুবকের উল্লাসের কথোপকথন। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সড়কে বেপরোয়া তারুণ্যের আওলা গতি! ঘটনা গত ১০ মার্চের। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়– রাজধানীর জুলাই স্মৃতি এক্সপ্রেসওয়েতে (৩০০ ফিট) প্রাইভেটকারে বসা কয়েক যুবক।
ভিডিও তাদেরই করা। সেখানে ওভার স্পিডিংয়ের ব্যাপারে চালককে উসকানি দিচ্ছেন যুবকরা। চালকও সায় দিয়ে গাড়িতে গতির ঝড় তুলে ওভারটেকিং করছেন। একপর্যায়ে গতির মিটারের কাটা ১২৫ কিলোমিটারে! পরক্ষণেই সামনের গাড়িকে ধাক্কা দেয় প্রাইভেটকারটি। বড় ধরনের কিছু হয়নি। কিন্তু প্রাইভেটকারের যুবকরা চালককে উদ্দেশ্য করে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে ওঠেন, ‘শিট, মামা শিট!’
শুধু এই ঘটনা না, ৩০০ ফিটে বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমেও তা তুলে ধরা হচ্ছে।
আইনে ৩০০ ফিট সড়কে প্রাইভেটকার ও বাসের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। বাইকের জন্য ৬০ ও ট্রাকের ৫০ কিলোমিটার। তবে, এই নিয়ম ভঙ্গ করায় এই এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই সড়কে সবচেয়ে বেশি ওভার স্পিডিং করে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার। তাদের কারণেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।
সরেজমিনে ৩০০ ফিট সড়কে দেখা যায়, সাঁ সাঁ গতিতে এগিয়ে চলছে গাড়ি। সীমাহীন গতি সামাল দিতে চেকপোস্ট বসিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। সন্দেহ হলে গাড়ি থামিয়ে কাগজ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছেন। তবে ওভার স্পিড মাপতে তাদের কাছে কোনো যন্ত্র নেই।

রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে নিষিদ্ধ হলেও অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক পরিদর্শক হাফিজুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, চেকপোস্ট বসানোর পর ২৪ ঘণ্টায় নানা কারণে ৬০ থেকে ৭০টি মামলা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগ ওভার স্পিডিংয়ের।
রাত বড্ড ভয়ংকর
দিনের তুলনায় রাতে ভিড় বাড়ে ৩০০ ফিটে। সরেজমিনে দেখা যায়, সন্ধ্যা হলেই সড়কজুড়ে জ্বলে ওঠে আলো। প্রশস্ত হাইওয়েতে তৈরি হয় ঝলমলে পরিবেশ। এ সময় জনতার পদধ্বণিতে মুখর হয়ে ওঠে এক্সপ্রেসওয়ে ও এর আশেপাশের এলাকা। কেউ আসেন মনরোম দৃশ্য ও পরিবেশ উপভোগ করতে। কেউ কেউ আবার বিকেলে আসেন সূর্যাস্ত দেখতে।
এক্সপ্রেসওয়ের ওভার দ্য টপ লুপের প্রান্ত ঘিরেও তৈরি হয় ভিড়। সেখানে বসে নানা রকমের দোকান। দেখা যায় ফটোগ্রাফারের আনাগোনা, যারা টাকার বিনিময়ে ছবি তুলে দেন। অনেকে তৈরি করেন ব্লগ আর টিকটিক ভিডিও। এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধনের পর থেকে ৩০০ ফিটের ওভার দ্য টপ গোলচত্বরগুলো ঢাকার জনপ্রিয় ‘পর্যটন স্পট’ হয়ে উঠেছে।
দিনে যেমন-তেমন। ফাঁকা এক্সপ্রেসওয়েতে রাতে শুরু হয় গাড়ির শোডাউন। কেউ প্রাইভেটকার নিয়ে আসেন তো, কেউ আবার বাইক। এরপর অধিকাংশ তরুণরা ওভার স্পিডে কার রেসিং করেন। এসব কারণে এই সড়কে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

গতি নির্দেশক থাকলেও চালকরা বেশির ভাগ সময় তা মানেন না।
পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির সামনে এক নম্বর ইউটার্নে ডিম বিক্রি করেন মনির হোসেন মনি। দেড় বছরে ধরে তিনি রাতে দোকান চালাচ্ছেন। রাত ২টার দিকে স্ট্রিমকে মনির হোসেন বলেন, আমি অসংখ্য এক্সিডেন্ট দেখেছি। প্রায় এসব হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, কারও হাত-পা নাই হয়ে গেছে। এখানে যারা আসে, তারা দল বেঁধে আসে। যারা একা আসে, তারা এক্সিডেন্ট করলে আমরা এগিয়ে যাই। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে দিই বা হাসপাতালে নিয়ে যাই।
ঝালমুড়ি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, এই এলাকায় এক্সিডেন্ট ডাল-ভাত। প্রতিদিন কেউ না কেউ এক্সিডেন্ট করে। এমন দিন খুব কম যায়, যেদিন এক্সিডেন্ট হয় না। রাত সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
এক্সপ্রেসওয়ে অটোরিকশা চলাচলে নিয়েধাজ্ঞা রয়েছে। তবে তা কেউ তোয়াক্কা করে না। অনেক সময় উল্টোপথে চলাচল করে অটোরিকশা।
অটোরিকশাচালক নূর আলম বলেন, ‘আমি এখানে অনেকদিন ধরে গাড়ি চালাই। ফলে প্রায়ই এক্সিডেন্টের ঘটনা দেখি। যারা এক্সিডেন্টের কবলে পড়ে, তারা ভর্তা হয়ে যায়। কিন্তু চলন্ত গাড়িতে থাকলে আমাদের কিছু করার থাকে না। ওদিকে মনোযোগ দিলে আমাদের গাড়িও এক্সিডেন্ট করবে।’
দুই নম্বর ইউটার্নে চা বিক্রি করেন আজিজুল ইসলাম। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, এই এলাকায় এক্সিডেন্ট নতুন কোনো ঘটনা না। এক্সিডেন্ট করে রাস্তায় পড়ে থাকে মানুষ। অনেক সময় তাদের দেখারও কেউ থাকে না।
দরকার মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ স্ট্রিমকে বলেন, ওভার স্পিডিং ধরার জন্য আমাদের পুলিশের স্পিড ক্যামেরা নাই। থাকলেও সেটা পর্যাপ্ত না। তাই স্পিড ক্যামেরা বসাতে হবে এবং সেটার নজরদারি করতে হবে। কারণ, স্পিড কন্ট্রোল করা এখন কোনো বড় সমস্যা না। এটি কন্ট্রোল করার জন্য প্রযুক্তি এভেলেবল। যারা ওভার স্পিডিং করবে, তাদের বড় অঙ্কের ফাইন করতে হবে। তাহলে মানুষ ভয়ে স্পিডিং করবে না। বাট আমরা পারছি না।

চেকপোস্ট বসিয়ে জরিমানা করেও ট্রাফিক পুলিশ চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
তিনি বলেন, আমাদের যানবাহনের ভেতরে কিন্তু স্পিড গভর্নর সিল লাগানো থাকে। সেটা এনশিওর করতে হবে। অবশ্যই মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মোটরসাইকেল সীমিত সংখ্যায় আনতে হবে। বেশির ভাগ স্পিডিং এবং দুর্ঘটনা ঘটছে মোটরসাইকেলের কারণে।
স্পিড ক্যামেরা নেই পুলিশের
ট্রাফিক ও থানা পুলিশ ৩০০ ফিটে ওভার স্পিডিংয়ের কথা বলেছেন। তবে এটি রোধে কোনো ক্যামেরার ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছেন তারা। ট্রাফিক গুলশান বিভাগের এডিসি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ৩০০ ফিটে দুর্ঘটনা ও ওভার স্পিডিং রোধে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজউকের মাধ্যমে স্পিড ক্যামেরা স্থাপনের চেষ্টা চলছে। ক্যামেরা পেলে ট্রাফিক পুলিশ আরও ভালোভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
খিলক্ষেত থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, ৩০০ ফিটে অধিকাংশ গাড়িই স্পিড লিমিট ফলো করে না। এগুলো আমরাও বলতে চাই। এখানে সবাই বেপরোয়াভাবে চলে। অনেক সময় পুলিশের ব্যারিকেড পর্যন্ত মানেন না তারা। আমরা এসব ঠেকাতে কাজ করছি। ইতোমধ্যে সিগন্যাল লাইট বসানো হয়েছে। জনগণের সচেতনতা ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন রূপগঞ্জ থানার ওসি সবজেল হোসেন।