Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দেড় মাস অতিবাহিত হলেও গণভোটের কার্যকারিতা নিয়ে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। সংসদের ভেতরে-বাইরে এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে সরকার ও বিরোধী দল। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় গণভোটের ভাগ্যে কী আছে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

মূলত গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে না বলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সিদ্ধান্তের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দলটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে এ নিয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশটি আগামী ১২ এপ্রিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে বলে জানা গেছে। কারণ বিধি অনুযায়ী নির্বাচনের দুই মাসের মাথায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার কথা ছিল।

বিএনপির বক্তব্য, অধ্যাদেশ ব্যবহার করে গণভোট হয়ে যাওয়ায় এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহার না থাকায়—অধ্যাদেশটি পাসের প্রয়োজন নেই। এতে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট অবৈধ হবে না। তবে ক্ষমতাসীন দলের এই সিদ্ধান্তসহ কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে রেখেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি তো জুলাই সনদে স্বাক্ষর ও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। যেহেতু গণভোটের রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে পড়েছে, সেহেতু ক্ষমতাসীন দল হিসেবে এর বাস্তবায়ন করার দায় আছে বিএনপির। তারা আগের অবস্থান থেকে সড়ে গেলে তাদের রাজনৈতিক ব্যত্যয় ঘটবে। সংবিধানে কী আছে কী নেই, তা নিয়ে তাদের মতামত থাকতে পারে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু সিদ্ধান্ত তো সংবিধানের বাইরে থেকেও সংযোজন করা হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে আমি মনে করি, এ নিয়ে বিএনপিকে সতর্কভাবে এগোতে হবে। সব পক্ষকে আশ্বস্ত করতে হবে। না হয় বিরোধী দলের সঙ্গে এখনই দূরত্ব তৈরি হতে পারে—যা তাদের রাজপথে ঠেলে দিতে পারে।’’

কী ছিল অধ্যাদেশে?

মূলত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ থেকেই গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে মতবিরোধ দেখা দেয়। এর মধ্যে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। আর জামায়াতসহ মিত্ররা এর পক্ষে বক্তব্য রাখেন। নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে তারা রাজপথে আন্দোলনও করেছিল। কিন্তু বিএনপির সায় না পাওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার তা মেনে নেয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের দিন ভিন্ন ব্যালটে গণভোটের পক্ষে রাজি হয়। একপর্যায়ে জামায়াতসহ তাদের মিত্ররাও তা মেনে নেয়। সে অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর এ নিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

এ অধ্যাদেশটির নম্বর ছিল ৬৭। এতে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কিনা, তা যাচাইয়ে গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত এ অধ্যাদেশ।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য আইন প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে। সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় রয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির কাছে এটি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে আশু ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে। তাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেন। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।

‘হ্যাঁ’র পক্ষে ভোটের পরিসংখ্যান

অধ্যাদেশের ৩ ক্রমিকে গণভোটের প্রশ্ন বিষয়ে এ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে—‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’; (হ্যাঁ/ না)।

গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ এবং এর প্রস্তাবনাগুলোর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি।

অপরদিকে, সংবিধান সংস্কারের বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। নির্বাচনের পর এসব তথ্য জানান ইসি’র জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক। তিনি জানান, গণভোটে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট। সব মিলিয়ে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি, যা মোট ভোটের ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ

যে কারণে মুখোমুখি সরকার ও বিরোধী দল

গত ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর পর থেকেই গণভোটের অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে। সম্প্রতি সরকার বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, গণভোট অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হবে না। মানে অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যাবে। তার মতে, যেহেতু গণভোট ইতোমধ্যে হয়ে গেছে, তাই অধ্যাদেশটির আর সামনে কোনও ব্যবহার নেই। আর গণভোট অধ্যাদেশ সংবিধানের অংশও নয়। সংবিধানে না থাকলে গণভোট হবে না। সংবিধানে এমন বিধান নেই। গণভোট আয়োজনে একটি অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। গণভোট হয়েছে। এই অধ্যাদেশের ব্যবহার হয়েছে। এর কোনও বিরোধিতা নেই। এই অধ্যাদেশকে সংসদে ধারণ করে ভবিষ্যতে ব্যবহার করার আর কিছু নেই।

সংসদে অধ্যাদেশটিকে অনুমোদন করা হবে কিনা– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। যেমন- সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে প্রণীত অধ্যাদেশের ব্যবহার আগামী ১০ বছরে বা পরবর্তী জনশুমারি না পর্যন্ত লাগবে না। গণভোট অধ্যাদেশের আর ব্যবহার নেই। তাই অনুমোদন করার কিছু নেই। ব্যবহার হয়ে গেছে। অধ্যাদেশটিকে বিল আকারে এনে আইনে পরিণত করা, রেটিফিকেশনের প্রয়োজন নেই।’’

সালাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশের ওপর আলোচনা হয়েছে। কতটি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন হবে, তা ২ এপ্রিল জানা যাবে। কিছু কিছু অধ্যাদেশ হুবহু পাস করা হবে। কিছু কিছু সংশোধনী আকারে উত্থাপন হবে। ১২ এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা থাকায় কিছু কিছু অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হবে না। পরবর্তীকালে বিল আকারে আনা হবে। বিরোধী দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, তা যথাযথভাবে থাকবে প্রতিবেদেন।

অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

এ বিষয়ে দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘গণভোটের পক্ষে তো বিএনপিও প্রচারণা চালিয়েছে। নিজেদের পক্ষে সরকার গঠনের রায়কে মেনে নিলে, গণভোটের রায় মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়? গণভোটের অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের মানুষ কিছুতেই মেনে নেবে না।’’

তিনি অভিযোগ করেন, বিচারপতি নিয়োগের কাউন্সিল গঠনের অধ্যাদেশ বিএনপি রহিত করা ও দুদকের ক্ষমতা খর্ব করতে চাচ্ছে। তবে বিশেষ কমিটির বৈঠকে আমাদের প্রতিনিধিরা এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা সরকারকে সুযোগ দিতে চাই। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদের ভেতরে-বাইরে আমাদের জোরালো ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।

কী আছে গণভোটের ভাগ্যে? 

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও দুই পক্ষের মতবিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি কী হয়, এ নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। অনেকে মনে করেন, এ ক্ষেত্রে দুপক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। না হয় এটি বাস্তবায়ন নাও হতে পারে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রথমত, নির্বাচনের আগে আমরা গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। তবে এখন যেহেতু এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল একটি অবস্থান নিয়েছে, সে বিষয়ে আমরা বলবো— এ ক্ষেত্রে বিএনপির দায়িত্ব বেশি। ঐকমত্য কমিশনেও বলা হয়েছিল— যারা নির্বাচনে বিজয়ী হবে, তারা চাইলে নিজেদের নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া বিষয়গুলো নিয়ে নিজেরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তারপরও বলবো, জনগণের পক্ষে যাওয়া বিষয়গুলোকে অবশ্যই বিএনপিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আর বিরোধী দলেরও উচিত হবে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান না নেওয়া।’’