দেশের সড়ক পরিবহনে অনিয়ম, দুর্ঘটনা রোধ ও সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ নিয়ে গত রোববার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভাকক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের কাছে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সড়কব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এর আগের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সেগুলোর কোনোটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। অতীত অভিজ্ঞতাও বলছে, পরিবহন সেক্টরে কেবল সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না। সেগুলো কার্যকর এবং বাস্তবায়নই এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গত ২৩ মার্চ এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আজ ৩১ মার্চের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশে বা সড়ক দখল করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান, যানবাহন মেরামতের ওয়ার্কশপ, ওয়েলডিং মেশিনসহ সব ধরনের অবৈধ দখলদারদের দোকানপাট সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। আগামীকাল ১ এপ্রিল থেকে এসব অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে।
রাজধানীর গণপরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে চালু হয়েছিল নগর পরিবহন। সেই সার্ভিস এখন বন্ধ। বাসের ভাড়া নৈরাজ্য কমাতে চালু হয়েছিল ই-টিকেটিং পদ্ধতি। এখন এই পদ্ধতিও মানা হচ্ছে না। সড়কে বাসের যাত্রী ওঠা-নামা করতে করা হয়েছিল বাস স্টপেজ, যাত্রী ছাউনি। কিন্তু এসব স্থানে এখন আর বাস থামে না। বাস থামে রাস্তার মাঝখানেই। যাত্রী ওঠানামা করানো হয় রাস্তার ওপর। ফ্লাইওভারগুলোতে যাত্রী ওঠা-নামা নিষিদ্ধ থাকলেও ফ্লাইওভারের উপরেই বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করানো হয়। রাজধানীর রাস্তার মোড়গুলো এখনো নিরাপদ হয়নি। রাস্তার মোড়গুলোতে যাত্রীবাহী, পণ্যবাহী যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা হয় দীর্ঘসময়। মোড়গুলোতে বাস দীর্ঘসময় দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠা নামা করানোর কারণে পেছনে পরিবহনের লম্বা সারি সৃষ্টি হয়। যানজটের কবলে পড়েন নগরবাসী। ঢাকায় বসবাসকারীদের প্রতিদিনকার প্রশ্ন গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধ হয়ে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?
রাজধানী ঢাকার সড়কের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রধান কারণ লাখ লাখ ব্যাটারি রিকশা। সেগুলো উচ্ছেদ করার কোনো উদ্যোগ এখনও নেয়া হয়নি। নগরবাসী আশা করেছিল বর্তমান নতুন সরকার পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খল্ াফেরাতে তথা যানজটের ভোগান্তি নিরসনে সর্বপ্রথম লাখ লাখ ব্যাটারি রিকশা ঢাকা থেকে উচ্ছেদ করবে। ঢাকায় ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস দুর্দান্ত প্রতাপে চলছে। সারাদেশে ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ৫ লাখের বেশি যানবাহন সড়কে চলাচল করছে। রাজধানী ঢাকার সড়কে এখন সাড়ে ৩ হাজার বাস-মিনিবাস যাত্রী পরিবহন করছে। রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা কত তার সঠিক হিসাব নেই কারো কাছে। এমন পরিস্থিতিতেই ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা আনতে আব্দুল্লাহপুর হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করা ২১টি কোম্পানির বাস টিকিট কাউন্টার ভিত্তিতে পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছিলেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম। গত বছর মার্চে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শিগগিরি টিকিট কাউন্টার ভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। এই রুটে প্রায় দুই হাজার ৬১০টি বাস চলবে। সবগুলো বাস একই রঙের (গোলাপি) হবে। এসব বাসে টিকিট ছাড়া কেউ উঠতে পারবেন না। যত্রতত্র বাসে ওঠা-নামাও করা যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গত ১৬ বছর ধরে ঢাকা শহরে বাস-মিনিবাস চুক্তিতে যাত্রী পরিবহন করছে। এতে গাড়ি চলাচলে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। যত্রতত্র যাত্রী উঠা-নামা করার কারণে সড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দুর্ঘটনা ঘটছে।
সাধারণ যাত্রীরা জানান, ঢাকায় লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহন রাস্তায় চলছে। রাস্তায় চলাচল করতে হয় বলে বাধ্য হয়েই তারা ওঠেন। সরকার বাসগুলোর দিকে নজর দেবেন বলে প্রত্যাশা তাদের। একটা দেশের রাজধানীতে চলাচল করা বাস এত লক্কড়-ঝক্কড় হতে পারে, তা কল্পনাতীত। সাম্প্রতিক সময়ে নানা ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হচ্ছে। অথচ আমাদের নগরবাসীরা কীভাবে চলাচল করছেন তা নিয়ে সরকারের ভ্রুক্ষেপ নেই। এখন যেসব নতুনভাবে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তা সঠিকভাবে পরিচালনা করলে হয়ত ভালো কিছু আশা করা যাবে। তবে নগরবাসীকে সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা উপহার দিতে হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি নজরদারিতে আনলে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।
গত রোববার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভাকক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী এসব সমস্যার বিষয়েই কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও কাউন্টারে গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, অনেক যাত্রী নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে জানেন না। এই অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় ভাড়া নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং যাত্রীরা প্রকৃত ভাড়া কত হওয়া উচিত, তা বুঝতে পারেন না। যাত্রীদের সুবিধার জন্য প্রতিটি কাউন্টার ও বাসে ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে নির্ধারিত ভাড়া প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। এতে করে যাত্রীরা সহজেই ভাড়া যাচাই করতে পারবেন এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ কমে আসবে। আগে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা কম ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতেন, যা পরবর্তীতে ভুল ধারণা তৈরি করেছে। সড়ক মন্ত্রী বলেন, কোনো পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিলে তা অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে ভিজিল্যান্স টিম, পুলিশ কন্ট্রোল রুমসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। যাত্রীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যেখানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আড়ালে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে। তবে সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। অনেক সময় পরিবহন মালিকরা নিজেদের সিদ্ধান্তে ভাড়া সমন্বয় করেন, যা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা যায়, ঢাকায় গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে প্রায় ৬ বছর আগে শুরু হয়েছিল বাস রুট রেশনালাইজেশনের কার্যক্রম। কিন্তু এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ২০২১ সালে চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ কমিটির সবশেষ ২৯তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি মোট দুটি সভা করেছেন। সবগুলো বাস কোম্পানিকে কয়েকটির মাধ্যমে পরিচালনা করার উদ্যোগের নামই বাস রুট রেশনালাইজেশন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে চেষ্টা ছিল ধীরে ধীরে পুরো রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা একটি কোম্পানির আওতায় আনা। এছাড়া ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস সড়ক থেকে তুলে নিয়ে আধুনিক মানের বাস নামানো, শহরের বাইরের চারিদিকে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, ডিপো নির্মাণ করা। ঢাকার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের রূপরেখা তৈরি করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। বাসগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকার কথা ছিল নির্দিষ্ট কোম্পানির। সেই কোম্পানিগুলো গঠন করা হয় জয়েন্ট ভেঞ্চার পদ্ধতিতে। ২০২১ সালে সেই কার্যক্রমও সফলতার মুখ দেখেনি। সবকিছুই ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের টাকা লুটের কৌশল। এ প্রসঙ্গে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিগত সরকারের আমলে পরিবহন নেতারা খুবই প্রভাবশালী ছিল, তারা চাইতো না ঢাকা নগর পরিবহন চালু হোক। তারা সব সময় এর বিরোধিতা করতো। কোনো বাস মালিক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ঢাকা নগর পরিবহনে তাদের বাস ঢুকতে চাইলে পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা তাকে নানাভাবে হয়রানি করতো, বাধা দিত।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সারাদেশে এখনও ৫ লাখের বেশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে। গণপরিবহনের মান উন্নত করতে হবে। সরকার চাইলেই সড়কে ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন বন্ধ করা সম্ভব।