দুই বস্তা আটা। তার বিনিময়ে ১৪ বছরের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলেন বাবা। যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষে গাজায় এমন পরিস্থিতি সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)। গতকাল শনিবার আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ, ক্ষুধা, বাস্তুহারা জীবন এবং ভেঙে পড়া সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে গাজায় কিশোরীদের বাল্যবিয়ের চাপ বাড়ছে। ইউএনএফপিএর সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সেখানে জোর করে বিয়ে ও বাল্যবিয়ের খবর ১২৩ শতাংশ বেড়েছে।
ইউএনএফপিএর হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গাজায় নথিভুক্ত নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু এপ্রিল থেকে জুনে জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় এ ধরনের ঘটনার খবর বেড়েছে ২৭ শতাংশ। তবে এই সংখ্যা গাজায় নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র নয়। এগুলো বিভিন্ন সেবাদাতা সংস্থার কাছে পৌঁছানো ঘটনা। সেবার পরিধি বাড়ায় আরও বেশি মানুষ অভিযোগ জানাতে পারছেন, এটিও বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ।
জোর করে বিয়ে ও বাল্যবিয়ে মোট নথিভুক্ত নির্যাতনের ২ দশমিক ৬ শতাংশ। আগে তা ছিল ২ শতাংশ। এই শ্রেণির ঘটনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভুক্তভোগী ১৮ থেকে ৫৯ বছরের নারী। ১২ থেকে ১৭ বছরের কিশোরীদের অংশ প্রায় ১৬ শতাংশ। যৌন নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। মোট ঘটনার মধ্যে এর হার ২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে বৃদ্ধি ৬১ শতাংশ।
এই তথ্যের পাশাপাশি ইউএনএফপিএ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজা শহর ও খান ইউনিসে ২৩০ জন ঘরছাড়া নারীর সঙ্গে ১৬টি দলীয় আলোচনার তথ্য সংগ্রহ করে। সেখানেই উঠে এসেছে দুই বস্তা আটার বিনিময়ে ১৪ বছরের মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সেই ঘটনা। আরও ছয় নারী বিভিন্ন ঘরছাড়া শিবিরে একই ধরনের বেঁচে থাকার বিনিময়ের কথা জানিয়েছেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় খাদ্যের অভাব, আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়া, ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয় শিবির এবং আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সেবা ভেঙে পড়েছে। ফলে কিছু পরিবার মেয়ের বিয়েকে খাবার বা নিরাপত্তা পাওয়ার উপায় হিসেবে দেখছে। আদালত, পুলিশ ও সামাজিক সেবাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেয়েদের আইনি সহায়তাও কমেছে।
২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ১ হাজার ১১ জনের ওপর করা ইউএনএফপিএর এক সমীক্ষায় ৭১ শতাংশ মেয়ে জানিয়েছিল যে, পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে ১৮ বছরের আগেই বিয়ের চাপ বেড়েছে। অথচ ২০০৯ সালে গাজায় ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ের হার ছিল ২৬ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে ১১ শতাংশে নেমেছিল।
গাজায় বিয়ের আইনে পুরুষের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং নারীর ১৭ বছর। বিশেষ পরিস্থিতিতে শরিয়াহ আদালত ব্যতিক্রমের অনুমতি দিতে পারে। আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ১৪ বছর ৭ মাস বয়সী মেয়ের বিয়ের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের সময় ইসলামি আদালত দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এই ব্যবস্থাও কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এদিকে এপ্রিল থেকে জুনে নারী ও কিশোরীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ৬৪ থেকে বেড়ে ৭৪টি হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩৪ হাজার থেকে বেড়ে ৬৫ হাজার নারী ও কিশোরীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাব ও নিরাপত্তার কারণে ১৭টি কেন্দ্র বন্ধও হয়েছে। জুলাইয়ের এক পরীক্ষায় দেখা যায়, পরিদর্শন করা ১৫টি শিবিরেই আলো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পানির সমস্যা রয়েছে। ফলে অনেক নারী রাতে বাইরে বেরোন না, কম পানি খান এবং শৌচাগার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়েন।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন এর আগে অভিযোগ করেছিল, গাজায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মাতৃসদন ও সন্তান জন্মদানের চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংসের ফলে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েল সেই অভিযোগ অস্বীকার করে কমিশনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করেছে। একই সময়ে ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, যুদ্ধের আগের তুলনায় কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে এবং মা ও নবজাতকের জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।