বিশ্বকাপ ফাইনালের মহারণ আজ। আবেগ, ভালোবাসা, রোমাঞ্চ, বেদনা আর প্রচণ্ড উত্তেজনার এই লড়াই হবে নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। একদিকে আকাশি-সাদা জার্সির আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে লাল রঙা স্পেন। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় অনুষ্ঠিত হবে ফাইনালের লড়াই। কে জিতবে? আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে ইতিহাস লিখবে, নাকি স্প্যানিশরা ২০১০ সালের পর আরও একবার জয় করবে ফুটবলবিশ্ব?
নিউইয়র্কের কুইন্সে ‘লিটল আর্জেন্টিনা’ নামে একটা এলাকা আছে। এমনিতে এই এলাকা নীরব পড়ে থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই জেগে ওঠে প্রচুর প্রাণশক্তি নিয়ে। আকাশি-সাদা পতাকার রঙে ঢেকে যায় রাস্তা, দোকানের সামনের বেঞ্চ এবং ফুটপাত। নিউইয়র্কে আরও একটি এলাকা আছে ব্রুকলিনে। যার নাম ‘লিটল বাংলাদেশ’। এই এলাকাও আর্জেন্টিনার রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ বাংলাদেশিই আর্জেন্টিনার সমর্থক। কেবল এক দুটি এলাকাই নয়, ম্যানহাটনে বসেছে আর্জেন্টাইনদের বিশেষ মেলা। সেই মেলায় যোগ দিতে হাজারো আর্জেন্টাইন হাজারো মাইল পাড়ি দিয়ে বুয়েন্স আয়ার্স থেকে এসেছেন নিউইয়র্কে। অন্যদিকে স্পেন? স্প্যানিশরা ফুটবলের উঠানে নতুন নতুন রেখা টানছে। লিখছে নতুন গল্প। একসময় যে শিল্পের নাম ছিল জাভি-ইনিয়েস্তা, আজ সেই শিল্পের নতুন মুখ ইয়ামাল, কুবারসি আর রদ্রিরা। বিশ্বকাপের আগে অচেনা এই নামগুলোই ফাইনাল লড়াইয়ে এসে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে হয়ে উঠল পরম পরিচিত। স্প্যানিশরা নিজের ফুটবল কারুকার্যেই দিনে দিনে ভারী করছে সমর্থকের পাল্লা। এখন বাংলাদেশেই স্পেনের সমর্থকের অভাব নেই।
১০৪ ম্যাচের বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়ে মুখোমুখি হচ্ছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ধারাবাহিক দুই দল। স্পেন এসেছে নিয়ন্ত্রিত, ছন্দময় ও শক্তিশালী রক্ষণ নিয়ে ফুটবল খেলতে খেলতে। আর আর্জেন্টিনা এসেছে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, অদম্য মানসিকতা ও লিওনেল মেসির জাদুতে ভর করে।
এই বিশ্বকাপে শুরুটা খুব একটা স্বস্তির ছিল না স্পেনের। উদ্বোধনী ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর সৌদি আরবকে ৪-০ এবং উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয় তারা। নকআউট পর্বে শুরুতে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিলেও পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে জয় পেয়েছে তারা। সেমিফাইনালে অবশ্য আর কোনো নাটক নয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপট দেখিয়ে ২-০ গোলে হারিয়েছে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্সকে। সে ম্যাচেই আবার স্পেন নিশ্চিত করেছে ২০১০ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্পেনের শক্তির জায়গা তাদের সংগঠিত রক্ষণ। পুরো টুর্নামেন্টে তারা এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গোল হজম করেছে। গোলরক্ষক উনাই সিমনের নেতৃত্বে গড়া এ রক্ষণই স্পেনকে এনে দিয়েছে টানা ছয়টি ক্লিনশিটের রেকর্ড। মাঝমাঠে রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের নিয়ন্ত্রণ, সামনে দানি ওলমো, লামিনে ইয়ামাল ও মিকেল ওইয়ারজাবালের সমন্বয় স্পেনকে করেছে আরও ভারসাম্যপূর্ণ। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পথ ছিল অনেক বেশি বন্ধুর। যেন দুর্গম গিরি পাড়ি দিয়েছে দলটি। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে হারিয়ে নিখুঁত সূচনা করেছিল লিওনেল স্কালোনির দল। আলজেরিয়ার বিপক্ষে কানসাস সিটিতে হ্যাটট্রিকসহ টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত আট গোল করেছেন ৩৯ বছর বয়সি লিওনেল মেসি।
কিন্তু নকআউটে শুরু হয় আসল পরীক্ষা। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় জয়, মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১১ মিনিটে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের লড়াই এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও ২-১ গোলের জয়; প্রতিটি ধাপেই আর্জেন্টিনা মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল যেন ছিল এই দলের চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে পিছিয়ে পড়ার পর এনজো ফার্নান্দেজ সমতা ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে মেসির নিখুঁত পাস থেকে জয়সূচক গোল করেন বদলি লটারো মার্তিনেজ। বারবার চাপের মুখে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই এখন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি। এই ফাইনাল মেসির জন্যও বিশেষ। স্পেনে গড়ে উঠেছে এই কিংবদন্তির ক্যারিয়ার। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় খেলে বিশ্বসেরা তারকা হয়ে ওঠা সেই ফুটবলার এবার স্পেনের বিপক্ষেই লড়াইয়ে নামবেন। টুর্নামেন্টে তাঁর আছে আট গোল। আছে চারটি অ্যাসিস্ট। গত রাতে এমবাপ্পে গোল বা অ্যাসিস্ট পেয়ে থাকলে মেসির কাজ বেড়েছে।
ফাইনালে তাকেও গোল করতে হবে গোল্ডেন বুট জয়ের জন্য। অসংখ্য অর্জনে ভরা ক্যারিয়ারে গোল্ডেন বুটের ট্রফিটাই এখনো অধরা মেসির। ইতিহাসও এই ফাইনালকে বাড়তি মাত্রা দিচ্ছে। বিশ্বকাপে দুই দলের একমাত্র আগের দেখা ১৯৬৬ সালে। সেই ম্যাচে ২-১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। দুই দল মোট ম্যাচ খেলেছে ১৪টি। ৬টি করে জয় আর্জেন্টিনা ও স্পেনের। দুবার ড্র। দুই মহাদেশের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে ফিনালিসিমায় মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল তাদের। যে ম্যাচ ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার কথা ছিল, ভাগ্য যেন সেটিকে তুলে রেখেছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চের জন্য। আজ তাই শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়। এটি মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো শেষ ম্যাচও! স্পেনের হারানো সিংহাসন ফিরে পাওয়ার সুযোগ। আর ফুটবলবিশ্বের জন্য দুই ভিন্ন দর্শনের এক মহারণ। নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির রাত শেষ পর্যন্ত কার নামে লেখা হবে? মেসির আর্জেন্টিনা নাকি দে লা ফুয়েন্তের স্পেন? সেই উত্তরের অপেক্ষায় আছে পুরো দুনিয়া।