Image description

আশরাফুর রহমান, তেহরান থেকে

প্রথম দিন: আকাশে ধোঁয়া, শহরে নীরবতা
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, সকাল সাড়ে নয়টা।

তেহরানের আকাশ তখন নির্মল।

বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে শীত ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছিল। প্রতিদিনের মতোই শহরটি তার নিজস্ব ছন্দে জেগে উঠেছিল।
অফিসগামী মানুষের ভিড়, স্কুলমুখী শিশুদের কোলাহল, মেট্রোর ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম, দোকানপাটের শাটার ওঠার শব্দে রাজধানী নতুন দিনের সূচনা করছিল। আমিও তখন অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
দুই ছেলে স্কুলে গেছে, স্ত্রী ঘরের কাজে ব্যস্ত।

 

হঠাৎ দূরে কোথাও বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এলো।

 

প্রথমে মনে হলো, হয়তো কোনো সামরিক মহড়া চলছে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরপর আরও কয়েকটি বিকট বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে উঠল। জানালার কাঁচ কাঁপল, ঘরের ভেতর নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা। টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যম খুলতেই জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির বাসভবনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক স্থাপনা।

আমার বাসা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে মধ্য তেহরানের পাস্তুর এলাকায় অবস্থিত সর্বোচ্চ নেতার আবাসিক দপ্তর। সেদিক থেকেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যাচ্ছিল। জানালার ওপারে সেই দৃশ্য দেখে বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জমে উঠল। ধোঁয়ার সেই কুণ্ডলী যেন মুহূর্তেই শহরের স্বাভাবিক সকালটিকে অনিশ্চয়তায় ঢেকে দিল।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই সাংবাদিক পরিচয়কে ছাপিয়ে গেল পিতৃত্বের উদ্বেগ। দুই ছেলের কথা মনে হতেই তৎক্ষণাৎ স্কুলের গাড়িচালককে ফোন করি। ফোন বন্ধ। এরপর স্কুলে যোগাযোগ করে জানতে পারি, পাস্তুর এলাকায় হামলার পরপরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও হামলার খবর আসতে শুরু করেছে। হরমুজগান প্রদেশের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার খবরও পৌঁছেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তেহরানসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাৎক্ষণিক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

আর দেরি না করে বাসার কাছের মেট্রোস্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করি। মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে বুঝতে পারলাম পরিস্থিতি কতটা অস্বাভাবিক। প্ল্যাটফর্মে মানুষের ভিড় ছিল অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি। ট্রেনে ওঠার পর লক্ষ্য করলাম, বেশিরভাগ মানুষের চোখ মোবাইল ফোনের পর্দায়। কেউ সর্বশেষ খবর পড়ছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখছেন। অনেকেই ফোনে স্বজনদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। কারও কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, কারও চোখে অনিশ্চয়তা। স্টেশনের ভেতরে মানুষের কথোপকথনের প্রধান বিষয় ছিল একটাই—কোথায় হামলা হয়েছে, আর কী হতে পারে।

মেট্রোস্টেশন থেকে বেরিয়ে বুঝলাম, শহরের স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থাও তখন চাপের মুখে। বহু চেষ্টা করেও কোনো ট্যাক্সি পেলাম না। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত একটি মোটরসাইকেলে করে স্কুলের উদ্দেশে রওনা হই।

স্কুলের সামনে পৌঁছে দেখি উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড়। কেউ সন্তানের হাত ধরে দ্রুত বাড়ির পথে রওনা হচ্ছেন, কেউ আবার স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। দুই ছেলেকে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছিলাম, তখনও জানতাম না যে সেই সকালটি ছিল এক দীর্ঘ ৪০ দিনের যুদ্ধের সূচনা। সামনে অপেক্ষা করছিল অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, তথ্যযুদ্ধ, বিস্ফোরণের শব্দে কেটে যাওয়া রাত এবং একই সঙ্গে এক শহরের অসাধারণ অভিযোজন ও টিকে থাকার গল্প।

যুদ্ধের শুরু: আতঙ্ক থেকে দ্রুত অভিযোজন
ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডাররা শহীদ হওয়ায় যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে তেহরানের মানুষের মধ্যে ছিল অনিশ্চয়তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুজব ছড়াচ্ছিল। বিদেশি সংবাদমাধ্যমে তেহরানের আকাশ অবরুদ্ধ করার খবর, কখনো সরকার পতন ও নেতা-মন্ত্রীদের রাজধানী ছেড়ে গণপালায়নের দাবি প্রচার হচ্ছিল। এরই মধ্যে সরকার নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট বন্যাধ করে দেওয়ায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে বিশেষ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ফিরে পেলেও কয়েকদিন তথ্যগত অবরুদ্ধতার মধ্যে ছিলাম।

Tehran
মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় ১৬৮টি শিশু শহীদ হয়

শিশুদের যুদ্ধ ও অভিভাবকদের চাপ
যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল শিশুদের মানসিকভাবে সামলে রাখা। আমার দুই ছেলেও দ্রুত বুঝে গিয়েছিল যে, ইরান যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিন তারা জানতে চাইত, ‘আজ কি আবার হামলা হবে?’, ‘আমরা দেশে যেতে পারব?’, ‘স্কুল কবে খুলবে’ কিংবা ‘ইন্টারনেট কবে চালু হবে?’

যুদ্ধের প্রথম দিনেই সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল ক্লাস শুরু হয়। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট না থাকলেও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাঠদান অব্যাহত থাকে।

অনেক সময় দূরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যেত, আর কম্পিউটারের পর্দায় শিক্ষক গণিত কিংবা ইতিহাস পড়িয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধের মাঝেও স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার এই প্রচেষ্টা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

থেমে না থাকা শহর
যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিন তেহরানের রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। যাদের সুযোগ ছিল, তারা সাময়িকভাবে শহরের বাইরে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বা উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে চলে গিয়েছিলেন। তেহরানে আমরা যে বাসায় থাকি সেখানে ৮টি ফ্ল্যাট। যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি পাওয়ায় একসময় ৫টি পরিবারই নিজ নিজ গ্রামে চলে যান। রাজধানীর কিছু এলাকায় যানবাহনের চাপ কমে আসে, অনেক অফিস সীমিত আকারে কাজ শুরু করে। আমি নিজেও বাসা থেকে অনলাইনে কাজ করতে থাকি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বোঝা গেল, তেহরান পুরোপুরি থেমে যাওয়ার শহর নয়।

যুদ্ধের পুরো সময় মেট্রো ছিল রাজধানীর প্রাণরেখা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাজে যাওয়া, পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছানো কিংবা জরুরি প্রয়োজনে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে এই পরিবহনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছেন। অনেকের কাছে মেট্রো শুধু যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না, বরং তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতিও তৈরি করেছিল।

বাস ও বিআরটি সেবাও সচল ছিল। চালক, স্টেশনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চিকিৎসাকর্মী, দমকল সদস্য এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিভাগের কর্মীরা প্রতিদিন নিজেদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। যুদ্ধের খবর প্রতিদিন শিরোনাম হয়েছে, কিন্তু শহরকে সচল রাখার পেছনে থাকা এই নীরব মানুষগুলোর অবদান খুব কমই আলোচনায় এসেছে।

যুদ্ধের মাঝেও অনেক সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংবাদমাধ্যম সীমিত পরিসরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। আমার নিজের কর্মস্থলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজের ধরন বদলানো হলেও সংবাদপ্রবাহ বন্ধ হয়নি। কারণ যুদ্ধের সময় তথ্যও এক ধরনের জরুরি সেবা।

Tehran
যুদ্ধের মাঝেও রাজপথে ভয়ডরহীন হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী

সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল মানুষের মানসিক অভিযোজন। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক চোখে পড়েছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার জায়গায় আসে সতর্ক স্বাভাবিকতা। মানুষ ঝুঁকির কথা জানত, কিন্তু জীবনকে পুরোপুরি স্থগিত করে দেয়নি। সন্তানদের অনলাইন ক্লাসে বসিয়েছে, কর্মস্থলে গেছে, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেছে এবং প্রতিদিনের জীবনকে যতটা সম্ভব সচল রাখার চেষ্টা করেছে।

অর্থনীতির নীরব যুদ্ধ: বাজার ও ব্যাংকের বাস্তবতা
যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক দিনে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি কিংবা ব্যাংকিং সেবায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল।

আমি নিয়মিত স্থানীয় বাজার, সুপারমার্কেট এবং নিকটবর্তী দোকানগুলোতে গিয়েছি। প্রথম দিকে কিছু পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হলেও বাজারে ব্যাপক সংকট দেখা যায়নি। রুটি, চাল, তেল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কিছু এলাকায় দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে, তবে তা আতঙ্কজনিত কেনাকাটার ফল ছিল, সরবরাহব্যবস্থার ভাঙনের কারণে নয়।

ব্যাংকিং ব্যবস্থাও সচল ছিল। শাখাগুলো সীমিত সময়ে খোলা থাকলেও আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়নি।

যুদ্ধের সেই দিনগুলোতে আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে একটি বিষয়। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অনিশ্চয়তা এবং তথ্যযুদ্ধের মধ্যেও সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। বাজারে মানুষ কেনাকাটা করেছে, ব্যাংকে গিয়েছে, দোকানদার দোকান খুলেছে, রুটিওয়ালা ভোরে চুলা জ্বালিয়েছে। যুদ্ধের মাঝেও জীবন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ ও অর্থনৈতিক স্থিতি
৪০ দিনের যুদ্ধে ইরান সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রেড ক্রিসেন্ট এবং বিভিন্ন মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে এক বহুমাত্রিক সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

যুদ্ধের প্রথম প্রহরেই জনগণের নগদ অর্থ প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সামাজিক ভর্তুকি এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিশোধ করা হয়, যা বাজারে হঠাৎ তৈরি হওয়া চাহিদাজনিত চাপকে সামাল দেয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ও মাঝারি ব্যবসা এবং উৎপাদন খাতকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ ঋণ ও আর্থিক প্যাকেজ চালু করা হয়। একই সঙ্গে বন্দরগুলো থেকে কাঁচামাল ও পণ্য খালাস প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল, যাতে সরবরাহ চেইন ভেঙে না পড়ে।

এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সমান্তরালে ফ্রন্টলাইনে কাজ করেছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। যুদ্ধকালীন উদ্ধার তৎপরতায় সংস্থাটির প্রায় ২৮ হাজার উদ্ধারকর্মী সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলেন।

পাশাপাশি, বাংলাদেশ. ভারত, পাকিস্তান, ইরাকসহ প্রায় ৩০টি মিত্র ও নিরপেক্ষ দেশ থেকে আসা নগদ অর্থ ও মানবিক সহায়তা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যুদ্ধপ্রভাবিত ১৯টি প্রদেশে বিতরণ করা হয়।

তেহরান প্রবাসী বাংলাদেশিরা
যুদ্ধের সেই ৪০ দিনে তেহরানে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ও নানা অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সময় পার করেছে। ইরানের রাজধানীতে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেডিও তেহরানের সাংবাদিক ও তাদের পরিবার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী এবং কিছু শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর তাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ।

নিরাপত্তাজনিত কারণে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। যুদ্ধের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু তেহরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের স্বজনরা তাদের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারছিলেন না। ফলে দুই পক্ষের উদ্বেগই ক্রমশ বাড়তে থাকে।

সে সময় তেহরানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে সম্ভবত কেবল আমারই আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল। ফলে অনেকেই আমার মাধ্যমে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে বার্তা পাঠাতেন। আমি তাদের খবর পৌঁছে দিতাম, আবার বাংলাদেশ থেকে কোনো উত্তর এলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে দিতাম।

যুদ্ধের সেই সময়ে কখনো কখনো মনে হয়েছে, আমি যেন সাংবাদিকের পাশাপাশি একটি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগকেন্দ্রের ভূমিকাও পালন করছি। একটি ছোট বার্তা, একটি খবর কিংবা পরিবারের কারও নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা তখন অনেক মানুষের কাছে অমূল্য হয়ে উঠেছিল।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় অনেক বাংলাদেশি সাময়িকভাবে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় বাংলাদেশ দূতাবাস দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ইচ্ছুকদের তালিকা প্রস্তুত করে। শেষ পর্যন্ত ১৮৬ জন বাংলাদেশি সড়কপথে প্রতিবেশী আজারবাইজান হয়ে সরকারের বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছান। পরবর্তীতে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও পাঁচ নাবিকসহ আরও ১৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তাদের অনেকেই এখনও ইরানে ফিরতে পারেননি, কেউ কেউ বিকল্প পথ ব্যবহার করছেন।

ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুত জীবন
যুদ্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য ছিল ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক ভবনগুলো। একটি বাড়ি শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়; সেখানে জমা থাকে বহু বছরের স্মৃতি, সম্পর্ক, আনন্দ-বেদনা। তাই যারা মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়েছেন, তাদের অনেকেই প্রথম দিকে দিশেহারা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করে তেহরান সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

যেসব ভবনের মেরামত বা পুনর্নির্মাণের কাজ চলছিল, সেসব ভবনের বাসিন্দাদের অস্থায়ীভাবে রাজধানীর বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়। বিশেষ করে লালেহ হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে শুধু থাকার ব্যবস্থাই নয়, শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার, চিকিৎসাসেবা, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ব্যবস্থাও করা হয়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। যুদ্ধ চলাকালে পশ্চিমা অনেক গণমাধ্যমে এমন একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, যেন তেহরান একটি বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রাজধানীতে বসবাসকারী একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন।

যুদ্ধের পুরো সময় এবং যুদ্ধবিরতির পরও যখনই বাইরে বেরিয়েছি, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি তেহরানের ২ নম্বর জেলায় থাকি। আমার বাসা থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে একটি আবাসিক ভবন হামলার শিকার হয়েছিল। কয়েক কিলোমিটার দূরে পাস্তুর এলাকায় সর্বোচ্চ নেতার আবাসিক দপ্তর ও আশপাশের কিছু স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু রাজধানীর সামগ্রিক চিত্র পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রচারিত বর্ণনার মতো ছিল না।

বাস্তবে হামলাগুলো ছিল নির্দিষ্ট এলাকাকেন্দ্রিক। কোনো কোনো জেলায় কয়েকটি ভবন বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়নি। যুদ্ধের পর দ্রুত সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় আজ তেহরানের অনেক এলাকায় বের হলে বোঝার উপায় নেই যে, কয়েক মাস আগেও শহরটি একটি বড় যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।

ভয়হীন সমাজ ও প্রতিরোধের সংস্কৃতি
২৩ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এই মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সংকট দেখেছি, কিন্তু ইরানিদের মতো এমন ভয়ডরহীন জাতি খুব কমই আমার চোখে পড়েছে। আকাশে যখন শত্রুর যুদ্ধবিমান উড়ছে, চারদিকে আছড়ে পড়ছে মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র, তখনও সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো পলায়নপর মনোভাব দেখিনি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও কেউ বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ড কিংবা মাটির অন্তত একশ মিটার নিচে মেট্রোস্টেশনে আশ্রয় নেয়নি। বরং ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শুনলেই তারা সপরিবারে বাসার জানালায় কিংবা ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

আকাশ চিরে যখন ইরানের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শত্রুর আঘাত রুখে দিতে ধেয়ে যাচ্ছিল, তখন সেই রোমাঞ্চকর ও ভয়ানক দৃশ্য তারা খালি চোখে দেখেছে, মোবাইলে ছবি তুলেছে, ভিডিও করেছে। আর পুরো তেহরানের আকাশ কাঁপিয়ে সমস্বরে ধ্বনি তুলেছে—‘আল্লাহু আকবার’।

এই অদম্য সাহসিকতার সমান্তরালে ইরানি জনগণের মাঝে ‘জানফিদা-এ-ইরান’ (ইরানের জন্য আত্মত্যাগ) নামে এক অভূতপূর্ব সামাজিক ও জাতীয় আন্দোলন গড়ে ওঠে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গের অঙ্গীকার নিয়ে এই অনলাইন প্রচারণায় ৩ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ৯২৩ জন মানুষ নিজেদের নাম নিবন্ধন করেন।

শুধু তাই নয়, টানা ১০৬ দিন ধরে প্রতি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ, সাধারণ পরিবার আর শ্রমজীবী মানুষ ব্যানার ও পতাকা হাতে সপরিবারে রাজপথে নেমে এসেছে। মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ জানাতে এবং নিজেদের দেশের সরকার ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন জোগাতে রাতের পর রাত তারা মুখর রেখেছে তেহরানের পথঘাট।

অনেক সময় এই সমাবেশের ঠিক পাশেই ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে, কেঁপে উঠেছে চারপাশ, কিন্তু মানুষ ভয়ে স্থান ত্যাগ করেনি। ধোঁয়া ম্লান হওয়ার আগেই দ্বিগুণ উৎসাহে এই প্রতিরোধ সমাবেশগুলো পুনরায় গর্জে উঠেছে।

বিভেদ ভুলে জাতীয় সংহতি
যুদ্ধের আগে ইরানের সমাজে রাজনৈতিক মতভেদ, অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং নানা সামাজিক বিতর্ক ছিল। সেগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়নি। কিন্তু যুদ্ধের সময় আমি দেখেছি এক ভিন্ন বাস্তবতা।

Tehran
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দিনে রাতে সমাবেশে অংশ নেয় দেশপ্রেমিক ইরানিরা

দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বহু মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ভুলে একত্রিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, গৃহিণী, প্রবীণ নাগরিক—সবাই কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধকালীন সামাজিক সংহতির অংশ হয়ে ওঠে।

ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বহিরাগত হুমকি একটি জাতির মধ্যে নতুন ধরনের ঐক্য সৃষ্টি করে। তেহরানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো শহর
৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ৪০ দিনের যুদ্ধ শেষে তেহরান ধীরে ধীরে তার পরিচিত ছন্দে ফিরে আসতে শুরু করে। বন্ধ দোকান খুলতে থাকে, অফিসপাড়া আবার ব্যস্ত হয়ে ওঠে, পার্কগুলোতে ফিরে আসে শিশুদের কোলাহল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে গেলেও তার স্মৃতি তখনো শহরের শরীর ও মানুষের মনে স্পষ্টভাবে রয়ে গেছে।

Tehran
যুদ্ধ চলাকালে তেহরানের লালেহ হোটেলে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়

যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরের দিন আমি ইচ্ছে করেই খুব সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। গত ৪০ দিনে বহুবার একই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেছি। কিন্তু সেদিনের দৃশ্য ছিল ভিন্ন।

তেহরানের আকাশে প্রথমবারের মতো কোনো বিস্ফোরণের আশঙ্কা ছিল না। শহরের ওপর এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। সেই নীরবতা ভয়ের নয়, স্বস্তির। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর যেন শহরটি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

একটি পার্কের সামনে কয়েকজন বৃদ্ধকে হাঁটতে দেখলাম। তাদের মধ্যে একজন ক্ষোভমিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ‘ওরা চেয়েছিল আমাদের হাঁটু ভাঙতে, কিন্তু ওরা জানত না যে যত বেশি বোমা হামলা হবে, মানুষ তত বেশি শক্ত হবে।’

ভাঙা নয়, পরীক্ষিত এক রাজধানী
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অনেক পরিবার এখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। শহরের কিছু ডাইনিং টেবিলে একটি চেয়ারের শূন্যতা স্থায়ী হয়ে গেছে। দেয়ালের ফাটল মেরামত করা যায়, ভাঙা জানালাও বদলে ফেলা সম্ভব। কিন্তু মানুষের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা এত সহজে পূরণ হয় না।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই তেহরানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি শহরের শক্তি তার অট্টালিকা, সেতু বা অবকাঠামোতে নয়। তার আসল শক্তি মানুষের মনোবল, অভিযোজন ক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মাঝেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছায়। ভবন ধ্বংস করা যায়, বিদ্যুৎ বন্ধ করা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়। কিন্তু একটি সমাজ যদি নিজের মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারে, তবে তাকে ভেঙে ফেলা কঠিন।

৪০ দিনের যুদ্ধ শেষে তেহরানকে তাই শুধু ক্ষতবিক্ষত শহর হিসেবে দেখা যায় না। এটি এমন এক রাজধানী, যা আঘাত পেয়েছে কিন্তু নুয়ে পড়েনি; ক্লান্ত হয়েছে কিন্তু থেমে যায়নি; পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে, তবুও নিজের অবস্থান হারায়নি।

 

২০০৩ সাল থেকে তেহরানে বসবাস করছেন বাংলাদেশি সাংবাদিক আশরাফুর রহমান। তিনি ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থার (আইআরআইবি) বাংলা বিভাগে কর্মরত। আধুনিক মেগাসিটি তেহরানে গত দুই দশকে তিনি বহু রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন, নিষেধাজ্ঞা এবং সংকট প্রত্যক্ষ করেছেন। তবে চলতি বছর সংঘটিত ৪০ দিনের মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আগ্রাসন তার সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে তীব্র অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

এই দীর্ঘ যুদ্ধকালীন সময়ে তেহরানের নাগরিক জীবন কীভাবে বদলে গিয়েছিল, কীভাবে শহরটি ভয়, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে টিকে ছিল—সেই অভিজ্ঞতারই এক প্রত্যক্ষ বিবরণ এই নিবন্ধে তুলে ধরেছেন তিনি।