Image description

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। বুধবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই বাজেট শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; আগামী এক বছরে দেশের প্রতিটি পরিবার, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং উদ্যোক্তার দৈনন্দিন জীবন কতটা সহজ বা কঠিন হবে, তারও একটি রূপরেখা।

প্রশ্ন এখন একটাই—এই বাজেটে সাধারণ মানুষ কী পেলো? বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কি কমবে? মানুষের আয় কি বাড়বে, নাকি খরচের চাপই বাড়বে?

সরকার বলছে, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য মানুষের দুর্ভোগ কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কারণ, কাগজে-কলমে ভালো পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবে মানুষের জীবনে পৌঁছাতে না পারলে প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না।

মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি কোথায়?

এবারের বাজেটে সরাসরি সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো—ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা। আগে এই সীমা ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক করদাতার করের চাপ কমবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার। একইভাবে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং নামজারিতেও টিআইএনের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। জনমতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে। বহুল আলোচিত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগও বাতিল করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি ইতিবাচক বার্তা গেছে।

বাজারে স্বস্তি মিলবে, নাকি খরচই বাড়বে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। সরকার আগামী এক বছরে সেটিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এই লক্ষ্য পূরণে সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে—বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমানো, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, বাজার তদারকি জোরদারের ঘোষণা, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা এবং  মাছসহ কয়েকটি খাতে ভ্যাট প্রত্যাহার।

এসব উদ্যোগ সফল হলে কিছু পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি পরিস্থিতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতার ওপর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেট তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে বড় স্বস্তি এনে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ কমতে পারে।

মানুষের আয় কি বাড়বে?

সরাসরি বেতন বাড়ানোর ঘোষণা খুব সীমিত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফলে এ খাতের কয়েক লাখ পরিবার বাড়তি আয় পেতে পারে।

তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ বেসরকারি খাতে কর্মরত। তাদের আয় বাড়ানোর জন্য সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেছেন, কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। অর্থাৎ সরকারের ধারণা—সরাসরি ভর্তুকির পরিবর্তে কর্মসংস্থান বাড়িয়ে মানুষের আয় বাড়ানোই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

কোন খাতগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেলো?

এবারের বাজেটে ব্যয়ের বড় অংশ গেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট খাতে। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে অর্থ বিভাগে। এরপর রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, পরিকল্পনা বিভাগ, খাদ্য, সমাজকল্যাণ ও কৃষি মন্ত্রণালয়।

উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা করা হয়েছে—যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। সরকারের আশা, এই উন্নয়ন ব্যয় অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কৃষক, শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের জন্য কী আছে?

সরকার কৃষিকে উৎপাদনশীল খাত হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, রফতানিমুখী শিল্প এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের সহায়তা, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমানো এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে। প্রবাসী উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরির কথা বলেছে সরকার।

কর ও ব্যবসায় কী পরিবর্তন এলো?

ব্যবসায়ীদের জন্যও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও প্রকৌশল কলেজের করহার কমানো হয়েছে। ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ভ্যাট কমানো হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমানো হয়েছে।

অন্যদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ঋণ গ্রহণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ে।

বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?

এই বাজেটের আকার বড় হলেও সামনে রয়েছে কয়েকটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা ও বৈদেশিক ঋণের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করতে হবে।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে আসার প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু তাৎক্ষণিক স্বস্তির উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাদের মতে, বাজেটের মূল পরীক্ষা হবে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ পায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার, ডিজিটাল খাতে ভ্যাট কমানো এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক হ্রাস—এসব সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি না হলে এসব সুবিধার বড় অংশই সীমিত হয়ে যেতে পারে।

মূল্যস্ফীতিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, গত দুই বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। তাই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর কার্যকর উদ্যোগ। তাদের ভাষায়, বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু লক্ষ্য নির্ধারণের চেয়ে তা বাস্তবায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং কারসাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মানুষের ব্যয়ের চাপ দ্রুত কমবে না।

আয় বাড়ানোর পথ কর্মসংস্থান, শুধু কর ছাড় নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, করছাড় সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি আনতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষের প্রধান চাহিদা হলো আয় বৃদ্ধি।

তারা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে একটি অংশের আয় বাড়বে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ বেসরকারি খাত, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের আয় বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

তাদের মতে, মানুষের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হচ্ছে একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ চাকরি। তাই কর্মসংস্থানকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। তবে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা।

তার ভাষায়, নতুন অর্থবছরের জন্য সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—যা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশপাশে থাকলে এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কাগজে-কলমে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের প্রকৃত রাজস্ব আদায় বিবেচনায় নিলে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে।’’ তার মতে, এই ব্যবধানই নতুন বাজেটের অন্যতম বড় দুর্বলতা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তিনি বলেন, ‘‘রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সরকারকে বাজেট ঘাটতি পূরণে আরও বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’’

এ কারণে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, বিশ্বের অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে না; বরং বন্ড বাজার ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করে সেখান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। বাংলাদেশকেও ধীরে ধীরে সেই পথেই এগোতে হবে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘‘বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও ক্রমেই বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, পুরো অর্থবছর শেষে এ খাতে ব্যয় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।’’

তার মতে, এই বাস্তবতায় শুধু উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না—বরং ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

মানবিক বাজেট, কিন্তু সক্ষমতা তৈরির প্রশ্নে ঘাটতি

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে বড় বরাদ্দ দেওয়া সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে।

তবে তারা মনে করেন, শুধু ভাতা বা আর্থিক সহায়তা বাড়ালেই মানবিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হয় না। দীর্ঘমেয়াদে মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে আরও বড় বিনিয়োগ দরকার। তাদের ভাষায়, রাষ্ট্র এখন মানুষের তাৎক্ষণিক কষ্ট লাঘবে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, কিন্তু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার জরুরি

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন, নতুন ব্যবসা সৃষ্টি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তোলার বিষয়টি আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার ছিল।

তাদের মতে, বর্তমানে দেশের বড় অংশের ব্যাংক ঋণ সীমিতসংখ্যক বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও তারা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন পেতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। এই বাস্তবতা পরিবর্তন না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।

কর কাঠামোতেও সংস্কার দরকার

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ এখনও ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ কর থেকে আসে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ তুলনামূলক বেশি করের চাপ বহন করেন।

তাদের মতে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়তে হলে উচ্চ আয় ও উচ্চ সম্পদের ওপর কর আদায় বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং কর ব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল করতে হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজেট বাস্তবায়নে বিকেন্দ্রীকরণও জরুরি বলে মনে করেন তারা।

বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বাজেটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে পারলেই সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে।

তাদের ভাষায়, কাগজে-কলমে বাজেটের অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। কিন্তু যদি বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসে, নতুন বিনিয়োগ না বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয় এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।

সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা কী?

এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো—করের কিছু চাপ কমানো, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা।

তবে বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষের প্রকৃত স্বস্তি নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে—প্রথমত, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কতটা কমে। দ্বিতীয়ত, নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ কতটা বাড়ে। তৃতীয়ত, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হয়।

সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এতে করের কিছু স্বস্তি, বিনিয়োগ উৎসাহ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-উন্নয়নে বড় বরাদ্দ এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে বাজারে দ্রব্যমূল্য কমা, আয় বাড়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আসার মাধ্যমে।

এখন পুরো দেশের নজর এক জায়গায়—বাজেটের প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তবে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে।