Image description

প্রায় ছয় বছর পর কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলেন। গত সপ্তাহে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন ফিদান।

এই সফর তুরস্কের বৃহত্তর ‘এশিয়া অ্যানিউ’ কৌশলের সর্বশেষ পদক্ষেপ। আঙ্কারা গত কয়েক বছর ধরে এই নীতিতে এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। সেদিক থেকে বিচার করলে দুই দেশ পরস্পরকে পছন্দ করে কি না, সেই প্রশ্ন এখন অবান্তর। দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কৌশলগত রূপ পাচ্ছে কি না, সেটাই মূল বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে হাকান ফিদানের বৈঠক। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে হাকান ফিদানের বৈঠক। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

মাত্র কয়েক বছর আগেও ঢাকা ও আঙ্কারার সামরিক সহযোগিতা কিছু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় এবং কূটনৈতিক যোগাযোগে সীমিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে আলোচনায় ড্রোন উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যৌথ উৎপাদন কারখানা, সামরিক আধুনিকায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নানা উদ্যোগ রয়েছে।

তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক শেকড়

১৯৭৪ সালে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বৈঠকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জোট ডি-৮ এর সদস্যও বটে।

আওয়ামী সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতবিরোধে সম্পর্ক কিছুদিন শীতল ছিল। সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব এখন আর নেই। সম্পর্ক আবার হারানো ভিত্তি ফিরে পেয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বাংলাদেশ তার সম্পর্ক বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। প্রচলিত বলয়ের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে।

জাতীয় নির্বাচনের পর এ বছরের শুরুতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তারা অধিকতর স্বাধীন নীতি প্রণয়নে আগ্রহী। সীমান্তের ওপারে প্রভুর বদলে বন্ধু খোঁজার কথা বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সেই মনোভাবই তুলে ধরেছেন।

প্রেক্ষাপট বিচার করলে কথাগুলোকে স্রেফ স্লোগান বলার উপায় নেই। সমতার ভিত্তিতে আচরণ করবে এমন অংশীদার চায় ঢাকা। দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের কোনো ঔপনিবেশিক অতীত নেই। ছোট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে প্রকৃত অংশীদারের মতো আচরণ করার ইতিহাস তাদের রয়েছে। তুরস্ক তাই ঢাকার এই চাওয়ার সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়।

সদিচ্ছা থেকে অংশীদারত্বের পথে

ঠিক এখানেই হাকান ফিদানের সফরের তাৎপর্য। তুরস্ক-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং স্বাস্থ্য খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়াতেও তারা একমত।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠ‌কের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খ‌লিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন। ছবি: সংগৃহীত

দ্বিপক্ষীয় বৈঠ‌কের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খ‌লিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন। ছবি: সংগৃহীত

দুই দেশের সরকার সাংস্কৃতিক সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষার কঠিন ভাষার পাশে সাংস্কৃতিক চুক্তিকে কিছুটা হালকা মনে হতে পারে। তবে কূটনীতি অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার আগে প্রতীকে অগ্রসর হয়। দুই দেশের সম্পর্ক শুধু লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই দেশের মানুষ ও সভ্যতাকেন্দ্রিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা খাতেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাত্রা সবচেয়ে বেশি। তুরস্কের প্রস্তুতকারকরা এরই মধ্যে বাংলাদেশে আগ্রহী ক্রেতা খুঁজে পেয়েছেন। দুই দেশের সামরিক বাহিনী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক দফা কাঠামোগত সংলাপে বসেছে। ফিদান স্পষ্ট করেছেন আঙ্কারা শুধু বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়।

তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী ওমর বোলাত আগের সফরে একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাবে বাংলাদেশে একটি প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল গড়ার কথা বলা হয়, যা বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রেতা ও বিক্রেতার গণ্ডি পেরিয়ে অংশীদারে পরিণত হবে।

অর্থনৈতিক দিক ততটাই সুনির্দিষ্ট। ২০২৫ সালের ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ। এছাড়াও সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কের টেকসই বাণিজ্যিক ভিত্তি তৈরি করবে।

বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশে তুর্কি বিনিয়োগকারীদের উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওষুধ এবং হাসপাতাল অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা। সব মিলিয়ে সত্যিকারের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের রূপ ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

আঞ্চলিক সমীকরণ ও ভূরাজনীতির হিসাব

দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তান। ইসলামবাদ-আঙ্কারার উষ্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নে সাহায্য করেছে। তুরস্কের অপর ঘনিষ্ঠ অংশীদার হলো চীন। বাংলাদেশে চীনেরও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে নাহিদ ইসলাম। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে নাহিদ ইসলাম। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

দেশগুলো কোনো সমন্বিত জোট হিসেবে কাজ করছে না। দেশগুলো আলাদা আলাদা পথে চলছে। তবে দেশগুলোর স্বার্থ ক্রমবর্ধমানভাবে একই দিকে নির্দেশ করছে। বাংলাদেশ এমন ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যেখানে এসব রাষ্ট্রের স্বার্থ মিলিত হয়।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো আঞ্চলিক প্রভাব। বাইরের কোনো দেশের প্রতিরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তা পর্যবেক্ষণ করবে। এক্ষেত্রে সবার ওপরে ভারত। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ঢাকার নতুন মেরুকরণ নিয়ে নয়াদিল্লি এমনিতেই অস্বস্তিতে রয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখতে হলেও নজর রাখতে হবে, প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দ্রুত বৃদ্ধি পেলে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো চুক্তি বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে এমন অনেক সমঝোতা স্মারক সইয়ের রেকর্ড রয়েছে যেগুলো কখনোই প্রকল্পে রূপ নেয়নি। একটি প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য জমি, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্তাবলি প্রয়োজন। শুল্ক আলোচনা এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাও সমান জরুরি। সই করা চুক্তিগুলো সূচনা মাত্র। চুক্তি কোনো কিছুর চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় না। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই সদিচ্ছাকে বাস্তব রূপ দেয়।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সম্পর্কের স্থায়িত্ব ধরে রাখা। বর্তমান সম্পর্ক মাত্র কয়েক মাস বয়সী সরকারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষমতা হাতবদল হলে পররাষ্ট্রনীতি কত দ্রুত বদলায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। প্রকৃত উদ্যোগ নেতা বা দলের মেয়াদের চেয়েও বেশি দিন টিকে। আঙ্কারা ও ঢাকাকে এই চুক্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের গভীরে নিতে হবে। যেকোনো দেশের ক্ষমতার পালাবদল যেন সহজেই চুক্তিগুলো বাতিল করতে না পারে।

বর্তমান পরিস্থিতির আশাব্যঞ্জক দিক হলো সম্পর্ক শূন্য থেকে শুরু হচ্ছে না। দুই দেশের মধ্যে সদিচ্ছা ও ঐতিহাসিক সহানুভূতি রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং মানবিক কাজ থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে তুরস্ককে চেনে। এখন আবেগের জায়গা থেকে কৌশলগত দিকে মনোযোগ সরাতে হবে।

তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ থেকে অনূদিত।