Image description

দক্ষিণ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নতুন বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ঋণ সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে উভয় দেশই বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে লক্ষ্য এক হলেও বাস্তবায়নের কৌশল ও অগ্রাধিকারে স্পষ্ট পার্থক্য ফুটে উঠেছে দুই দেশের বাজেট দর্শনে। বাংলাদেশের বাজেট যেখানে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, সেখানে পাকিস্তানের বাজেট ১৮.৯ ট্রিলিয়ন রুপি বা প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার। সে হিসাবে দুই দেশের বাজেটের পার্থক্য প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।

পাকিস্তান যেখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণ, ঋণ পরিশোধ এবং রাজস্ব ঘাটতি সামাল দেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

বাংলাদেশের বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগকে বড় করে দেখা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের বাজেটে সবচেয়ে বড় অংশ চলে গেছে ঋণ পরিশোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ে, যা দেশটির অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক নির্ভরতার বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে বাংলাদেশ উন্নয়নমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে পাকিস্তান বেশি মনোযোগ দিয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করার দিকে।

বাংলাদেশ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই মূল লক্ষ্য। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ হাজার চিকিৎসক ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণাও এসেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব ২০২৫ অর্থবছরের জন্য ১৮.৯ ট্রিলিয়ন রুপির বাজেট (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা) উপস্থাপন করেছেন। বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩.৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ১২ শতাংশ। দেশটির কর আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ৫ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা)।

পাকিস্তানের বাজেটে সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত ঋণ পরিশোধ। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯.৮ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা), যা মোট বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি। প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ২.১ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা)। একই সঙ্গে জ্বালানিতে লেভি বৃদ্ধি, কর অব্যাহতি কমানো এবং নন-ফাইলারদের ওপর বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের বাজেট মূলত আইএমএফের শর্ত পূরণ ও নতুন বেইলআউট কর্মসূচি নিশ্চিত করার দিকেই বেশি কেন্দ্রিত।