ফের আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দ্বিতীয় ধাপের এই আলোচনাও পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট। যদিও নির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্ক সফর শেষে আগামী সপ্তাহের শুরুতেই ফের সংলাপে বসতে পারে তেহরান ও ওয়াশিংটন।
এদিকে বিশ্ব জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে এখনো সংকট রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় দেশই সেখানে অবরোধ দেয়ায় পরিস্থিতি আগের তুলনায় এখন আরও জটিল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সেখানে বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। রণতরীর সংখ্যা অন্তত ১৫টি। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবরোধের ফলে শঙ্কায় হরমুজগামী জাহাজগুলো। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে দিনে ১৫০টির মতো জাহাজ চলাচল করতো বর্তমানে সেই সংখ্যা ১০ থেকে ১৫টিতে নেমে এসেছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ এর প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেছেন, ইউরোপের জেট ফুয়েলের মজুত আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বিশ্ব। এই সংকট এশিয়ার দেশগুলোতে সবার আগে আঘাত হানবে বলেও সতর্ক করেছেন আইইএ প্রধান। তিনি বলেছেন, হরমুজ স্বাভাবিক না হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানি করা দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। হরমুজ নিয়ে এবার চীনও মুখ খুলেছে। গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। তিনি তেহরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় পাকিস্তানের তৎপরতার বেশ প্রশংসা করেছে হোয়াইট হাউস। লিভিট জানান, অনেক দেশই মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের উপরই ভরসা রেখেছেন। ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সূত্রগুলো দাবি করছে, দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিরোধপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। বুধবার রাতে তেহরান সফরে যান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি এবং স্পিকার বাকের গালিবাফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য কমে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যদি সমঝোতা হয় তাহলে দ্রুতই হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হবে। মধ্যস্থতাকারীরা দাবি করেছেন, দুই দেশের মধ্যে অনেক বিরোধপূর্ণ ইস্যুতে অগ্রগতি হয়েছে। যদিও তেহরান জানিয়েছে, পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা এখনো সন্তোষজনক স্থানে পৌঁছায়নি। ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদ চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক খবর দিলেও হরমুজ নিয়ে সংকট কাটেনি। প্রণালিটির কার্যক্রম সীমিত থাকায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে জ্বালানি খাত। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বলছে, হরমুজ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ম্যারাথন আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এবার তৎপরতা বাড়িয়েছে পাকিস্তান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে গতকাল এক কর্মকর্তা জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের সাম্প্রতিক সফরের কারণেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে আশা তৈরি হয়েছে। এদিকে চুক্তিতে ইরানকে বাধ্য করতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। যার প্রমাণ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের গতকালের হুমকি। বৃহস্পতিবার পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে ফের সামরিক অভিযানের জন্য তাদের সেনারা প্রস্তুত রয়েছে। তার এই হুমকি প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে চুক্তিতে বাধ্য করার কৌশল বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ: পাকিস্তান জানিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি যেকোনো শান্তি আলোচনার একটি অপরিহার্য অংশ। এ বিষয়ে গতকাল ইসরাইল ও লেবানন আলোচনায় বসবে বলে জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যদিও লেবাননের তিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নিকট ভবিষ্যতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের মধ্যে কোনো ফোনালাপের পরিকল্পনা নেই। দুইজন কর্মকর্তা আরও যোগ করেন যে, এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননে তীব্র লড়াই অব্যাহত ছিল। লেবাননের একজন ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ইসরাইলি বিমান হামলায় দক্ষিণ লেবাননের সঙ্গে দেশটির বাকি অংশের সংযোগকারী সর্বশেষ সেতুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, সিরিয়াগামী সড়কে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো ইসরাইলি হামলায় একজন নিহত হয়েছেন।
পারমাণবিক ইস্যু এখনো অমীমাংসিত: গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এর জেরে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলা এবং ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাতকে নতুন করে উস্কে দেয়। এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। অন্যদিকে, জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম বিশ্ব জুড়ে বিনিয়োগকারী ও নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। গত সপ্তাহের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক শোধন ছিল একটি প্রধান জটিলতা। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সকল পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। যা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘদিনের দাবি থেকে একধাপ সরে আসার ইঙ্গিত। অপরদিকে তেহরান ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়ে রাজি হয়েছে। ওয়াশিংটন ইরান থেকে সমস্ত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলার জন্য চাপ দিচ্ছে, আর তেহরান দাবি করেছে তাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ: যুদ্ধের ফলে ইরান কার্যত নিজের জাহাজ ছাড়া অন্যদের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, যা পারস্য উপসাগর থেকে রপ্তানি মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল-নির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে তাদের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করেছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানি নৌ-চলাচলের ওপর অবরোধের পরিধি আরও বাড়িয়েছে। এর আওতায় তারা ‘নিষিদ্ধ পণ্য’ হিসেবে অস্ত্র, অস্ত্র সরঞ্জাম, গোলাবারুদ, পারমাণবিক সামগ্রী, অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং লোহা, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
মার্কিন নৌবাহিনী একটি সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ইরানি ভূখণ্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে এমন সন্দেহভাজন যেকোনো জাহাজ তল্লাশি এবং জব্দ করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন বলেছেন, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী কোনো জাহাজে আরোহণ করেনি এবং ১৩টি জাহাজ ফিরিয়ে দিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে ব্রিফ করা একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি চুক্তি সম্পাদিত হলে এবং সংঘাতের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হলে ইরান ওমান সংলগ্ন প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলোকে কোনো হামলার ঝুঁকি ছাড়াই অবাধে চলাচলের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।