Image description

আন্তর্জাতিক বাজারে গত একমাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। গত মে মাসে গড়ে বিশ্ববাজারে অশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ব্যারেল প্রতি ১৮ ডলার। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রর মধ্যে চুক্তি সইয়ের পর ধারণা করা হচ্ছে— জ্বালানি তেলের দাম আরও কমবে। প্রশ্ন উঠেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তো দাম কমলো, এখন দেশের বাজারে কী হবে?

সরকারের তরফ থেকে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় বলা হয়েছিল— আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে দ্রুত দেশের বাজারেও দাম কমানো হবে।


গত দুই মাসের জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১ মে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৭ ডলার। জুনের ১ তারিখে এই দাম কমে ব্যারেল প্রতি ৯৮ ডলারে নেমে আসে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পর বুধবার (১৭ জুন) তেলের দাম ব্যারেল প্রতি আরও ১৮ ডলার কমে ৭৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই এই দাম আর কমবে।


গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে ও জুন মাসে প্রতি ব্যারেল অশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে ৬১ থেকে ৬৫ ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ এখনকার আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এক বছর আগে ব্যারেল প্রতি কম ছিল ১৪ ডলার।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে ওঠে। তখন সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়েছিল। চলতি জুনে আবারও ডিজেলের দাম না বাড়িয়ে অন্য তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে গত মে মাসে দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার। যা বর্তমানে ৭৯ ডলার, অর্থাৎ ব্যারেল প্রতি দাম কমেছে ৪১ ডলার। তাহলে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমবে কিনা ভোক্তাদের মাঝে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও দেশে তেলের দাম বাড়ানোর অতীত ইতিহাস বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে যে পরিমাণ বাড়ানো হয়, পরবর্তী সময়ে সেই হারে আর দাম কমে না।

যদিও জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্য বাড়ানোর পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত ১ জুন বলেছেন, ‘‘আমরা আশাবাদী, মধ্যপ্রাচ্য সংকট শিগগিরই সমাধান হবে। আমি খুব দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও কমবে।’’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিমাসের শেষে সরকার জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে। এর ব্যতিক্রম করবে কিনা। এর আগে দেখা গেছে, এলপিজি ব্যবসায়ীদের চাপে সম্প্রতি একমাসে দুবার এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে।

গত ১৮ এপ্রিল সব চেয়ে বেশি তেলের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, অর্থাৎ লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা হয়। পেট্রোলের দাম লিটারে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। এরপর জুন মাসের জন্য ডিজেলের দাম ঠিক রেখে অন্য সব তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। জুনে অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব মোহম্মদ সাইফুল ইসলাম ও বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।

বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে মন্ত্রণালয়। ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রে বিইআরসি শুনানি করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে থাকে। বিইআরসির ক্ষেত্রে নিয়ম করা আছে— দামের ১০ ভাগ এদিক- ওদিক হলে আমরা মাসের মাঝামাঝি সমন্বয় করতে পারবো। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে এই নিয়ম থাকলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও মাসের মাঝেও সমন্বয় করতে পারতো।’’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘‘একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের উচিত মানুষের সমস্যা বিবেচনা করা। কিন্তু কোনও সরকারই তা করে না। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে, দেশে যে পরিমাণ বাড়ানো হয়—কমলে সে পরিমাণ আর কমানো হয় না। এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা থাকলেই সম্ভব।’’

তিনি বলেন, ‘‘এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমছে, তার ভিত্তিতে এখনই দাম সমন্বয় সম্ভব, যদি সরকার সেটা চায় তবেই।’’