Image description

ইসলামী ব্যাংকের জন্য একটি বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ প্রস্তুত করার ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটিকে ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহের অনিশ্চয়তা ও গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িকের পর আমানতকারীদের আশ্বস্ত করতে তারল্য সহায়তা এবং নতুন কিছু হস্তক্ষেপমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে এবং আমানতকারীরা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই তাদের টাকা তুলতে পারেন তা নিশ্চিত করতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে অতিরিক্ত কিছু পদক্ষেপ নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গভর্নর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে কিছু কার্যকরী ব্যবস্থা রয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আমরা সেগুলো প্রয়োগ করব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমানতকারীদের কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। তারা যখনই চাইবেন, তাদের টাকা তুলে নিতে পারবেন।’

নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং এর জেরে গ্রাহকদের আমানত তুলে নেওয়ার চাপের মুখে পড়া দেশের বৃহত্তম এই ইসলামি ব্যাংকটিকে সহায়তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে এবার আরও সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছে—তার সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত মিলল গভর্নরের এই বক্তব্যে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনে জরুরি তারল্য সহায়তা দিতেও প্রস্তুত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো ধরনের জরুরি তারল্য সহায়তা আমরা দেব।’

ব্যাংকটির জন্য এই মুহূর্তে এই ধরনের আশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গভর্নরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ৯৩ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৯৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা ৯২ শতাংশের চেয়ে অনেকটাই বেশি।

তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এই অনুপাত কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছি।’ এই অনুপাতের আকস্মিক বৃদ্ধি এটিই নির্দেশ করে যে, ঋণ সমন্বয়ের চেয়ে দ্রুত গতিতে আমানত তুলে নেওয়ার কারণে ব্যাংকটির ওপর তারল্যের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।

ব্যাংকটির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর গত কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণেই মূলত এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত দলগুলো তার অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। এই বিরোধ কিছু আমানতকারীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে, যার ফলে দেশজুড়ে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখা থেকে টাকা তোলার প্রবণতা বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো এই আবেদনের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অযাচিত হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ উঠেছে, সে প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকে সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গভর্নর। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই ইসলামী ব্যাংক পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল এবং পরবর্তীতে অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে একজন পরিচালককে পরিবর্তন করা হয়। ঈদের আগে চেয়ারম্যান পদত্যাগ করায় বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল, কারণ আইন অনুযায়ী ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরিচালক ছাড়া এত বড় একটি ‘সিস্টেমিক ব্যাংক’ (আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক) চলতে পারে না।

গভর্নর বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক, তাই আমাদের অবিলম্বে কাউকে নিয়োগ দিতে হয়েছিল।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সীমিত। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি বোর্ড পেয়েছিলাম। অনিয়মের অভিযোগের কারণে কেবল একজন পরিচালককে পরিবর্তন করা হয়েছিল। এর বাইরে আমরা আর কিছুই করিনি।’

ইসলামী ব্যাংকের সুশাসন, তারল্য এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুল আলমকে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। গভর্নর স্পষ্ট করেছেন, এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিকে স্থিতিশীল রাখাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান অগ্রাধিকার।