ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেন ভারতে গ্রেফতারের পর তাদের দেশে ফেরাতে সরকার জোর তৎপরতা শুরু করেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তির আলোকে ওই দুই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চিঠি প্রস্তুত করেছে ওসমান হাদি হত্যা মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দু-একদিনের মধ্যে ভারত সরকারের কাছে আসামিদের হস্তান্তর চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবে সরকার।
ইতোমধ্যে আসামিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ‘কনসুলার অ্যাকসেস’ চেয়েছে বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, হাদি হত্যার দুই আসামিকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সোমবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের (ফয়সাল ও আলমগীর) দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।’ এছাড়া সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের আইজিও আসামিদের দেশে আনার ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন হিসাবে ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার দুজনকে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ফেরত চাওয়া হবে।’
ভারতের কাছে ‘পর্যাপ্ত তথ্য’ চাওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমে এ দুজনকে ফিরিয়ে আনা হবে। রোববার কলকাতায় আমাদের হাইকমিশনের কর্মকর্তারা ভারতের কাছে কনসুলার অ্যাকসেস চেয়েছে। এই অ্যাকসেস পেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। কলকাতা থেকে এখনো কিছু জানায়নি।’
এদিকে সবাই যখন মূল আসামিদের দেশে ফেরাতে তৎপর, তখন বিভিন্ন মহল থেকে জোর দাবি উঠছে হত্যার নির্দেশদাতারা যেন কোনোভাবেই দেশ ছাড়তে না পারে। তারা বলছেন, মূল আসামি গ্রেফতারের পর হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা নির্দেশদাতা গডফাদাররা নিশ্চয় নড়েচড়ে বসছেন। কারণ, শুটার ফয়সালকে রিমান্ডে নেওয়া হলে সে নির্দেশদাতাদের মুখোশ খুলে দেবে-এটাই স্বাভাবিক। ফলে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগাম সব ব্যবস্থা নিতে হবে।
ওসমান হাদি হত্যা মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের মূল দাবি, যারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত ছিল, তারা যেন কোনোভাবেই দেশত্যাগ করতে না পারে।’ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) তদন্তকারীরাও মনে করছেন, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও বড় কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে। এর আগে ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্ত চলাকালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেক রাঘববোয়ালের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম বাপ্পীসহ আরও অনেকের নাম আলোচনায় উঠে আসে। হত্যা মিশন বাস্তবায়নে মোটা অঙ্কের টাকাও বিনিয়োগ করা হয়।
তবে ডিবি তদন্ত শেষে ৬ জানুয়ারি ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়। চার্জশিটে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা হিসাবে চিহ্নিত করে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীকে। অবশ্য এ চার্জশিটের নারাজি দেন মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের।
রোববার পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তাদের কাছে গোপন ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ছিল-বাংলাদেশে চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধ করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিক পালিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে। সুযোগ পেলে তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এসটিএফ আরও জানায়, এ তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে বনগাঁও এলাকা থেকে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তারা হলেন পটুয়াখালীর ফয়সাল করিম মাসুদ এবং ঢাকার আলমগীর হোসেন।
যুগান্তরের কলকাতা প্রতিনিধি জানান, গ্রেফতার ফয়সাল ও আলমগীরকে আদালতের নির্দেশে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সোমবার অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে গ্রেফতার ব্যক্তিদের সল্টলেকে অবস্থিত এসটিএফের সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। দিনভর সেখানে তাদের জেরা করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও বড় কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে। এ কারণেই গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তদন্তে যুক্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাদের গতিবিধি, যোগাযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অন্য কোনো ব্যক্তির নাম রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় তাদের গত কয়েকদিনের চলাফেরার তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে হাদি হত্যা মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ভারতে গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিষয়ে করণীয় জানতে চাইলে সিআইডিপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাতউল্ল্যাহ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘মূল আসামিসহ দুজন ভারতে গ্রেফতারের বিষয়টি আমরা অফিশিয়ালি জানতে পেরেছি। ভারতের সঙ্গে আমাদের এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তি আছে। ওই চুক্তির আলোকে ফরেন মিনিস্ট্রির মাধ্যমে আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনব। এ লক্ষ্যে আমরা চিঠি প্রস্তুত করছি। চিঠির সঙ্গে মামলার কপিসহ অনেক পেপার রেডি করে নোটারির মাধ্যমে দিতে হবে। আমাদের পুরো টিম কাজ করছে। আজই (সোমবার) ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে। আজ-কালের মধ্যে চিঠি চলে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চিঠিটি পুলিশ হেডকোয়াটার্সের মাধ্যমে হোম মিনিস্ট্রি হয়ে ফরেন মিনিস্ট্রিতে যাবে। পরে ফরেন মিনিস্ট্রির লিগ্যাল উইং থেকে কলকাতায় যাবে।’
সিআইডির কোনো টিম আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ভারতে যাবে কি না জানতে চাইলে সিআইডিপ্রধান বলেন, ‘আমরা তাদের (আসামি) দেশে নিয়ে আসব ইনশাল্লাহ।’
মূল আসামি ফয়সালের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অবৈধ লেনদেনের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ইউনিট। এক্ষেত্রে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডিপ্রধান মো. ছিবগাতউল্ল্যাহ বলেন, ‘অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তে আমাদের অনেক ডেভেলপমেন্ট আছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এ মুহূর্তে আমি কিছু বলব না।
হত্যাকাণ্ডের গডফাদাররা দেশছাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির এই শীর্ষ কর্তা বলেন, ‘বিদেশ থেকে আসামি নিয়ে আসা হচ্ছে, তাহলে দেশ থেকে কেমন করে যাবে।’
কনসুলার অ্যাকসেস : ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার ওসমান হাদি হত্যা মামলার দুই আসামির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কনসুলার অ্যাকসেস চেয়েছে কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশন। রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে উপহাইকমিশন জানায়, বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেফতারের তথ্য কলকাতা পুলিশ উপহাইকমিশনকে অবহিত করেছে। এরপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কনসুলার অ্যাকসেস চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় যাওয়ার পথে ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। হাদি হত্যা মামলার তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন আলমত জব্দ করা হয়। গ্রেফতার করা হয় ফয়সালের বাবা, মা, স্ত্রীসহ বেশ কয়েকজনকে।
তবে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল অধরাই থেকে যায়। তদন্ত চলাকালে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মূল শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর ঘটনার রাতেই মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের পুলিশের এ দাবি প্রথম থেকেই নাকচ করে আসছিল ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় সিআইডি। ২৩ ডিসেম্বর আদালত ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন। সেদিনই ফয়সালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।