Image description
বিশ্ববাজারে বাড়ছে তেলের দাম, প্রভাব বাংলাদেশে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে হু-হু করে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বড় ধরনের চাপে পড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি জানিয়েছে, সোমবারের জ্বালানি তেলের দাম ধরলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে মাসে দেড় হাজার কোটি টাকার বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। লিটারপ্রতি ডিজেলের ক্রয়মূল্য পড়ছে ১৪২ টাকার বেশি। আজ মঙ্গলবার যদি বিশ্ববাজারে দাম আরও বাড়ে তখন এই মূল্য আরও বাড়বে। অবশ্য এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাড়তি মূল্য ধরলে প্রতিমাসে তেল এবং গ্যাস আমদানিতে বাড়তি ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

যুদ্ধের কারণে বিশ্ব পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবকটি দেশের তেলের ডিপো বা রিফাইনারিতে হামলা করা হয়েছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো বড় রিফাইনারি বন্ধ হচ্ছে বা হামলার শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাজারে যাও পাওয়া যাচ্ছে সেই তেলের দাম অনেক বেশি, তাতে হাত দেওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে সরকারকে। জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম সোমবার যুগান্তরকে বলেছেন, তেল এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সব উদ্যোগ নিয়েছে। জানা গেছে, দেশের তেল এবং গ্যাসের পরিস্থিতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রতিদিন একটি প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের রিফাইনারিতে হামলার পর বিশ্ববাজারে সোমবার সপ্তাহের প্রথম দিনে ১১ শতাংশের বেশি তেলের দাম বেড়েছে। ব্র্যান্ড ক্রুড ১০৪ ডলার পার হয়েছে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে এই তেলের দাম ছিল ৮০ ডলারের নিচে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহকারী প্রায় সবকটি ডিপো বা রিফাইনারিতে হামলার কারণে তেলের এই দাম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ বলতে পারছে না। অনেক রিফাইনারি সতর্কতা হিসাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের ২০ শতাংশের বেশি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের চ্যানেল হরমুজ প্রণালি বন্ধ ৮ দিন ধরে। ফলে তেলের সরবরাহ বেশ কমেছে। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ না হলে বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ। এই সময়ে সরকারকে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিপিসি জানিয়েছে, সোমবার ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রামে ভিড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী জাহাজ থেকে খালাসের এক সপ্তাহ আগে এবং পরে বিশ্ববাজারে তেলের দর নিয়ে (প্লাটস প্রাইজ) দাম পরিশোধ করা হয়। তবে গতকাল খালাস করা তেলের আগের সপ্তাহের মূল্য ধরলে প্রতি ব্যারেলের মূল্য পড়ে ১৩৭ দশমিক ৪৬ ডলার। এই হিসাবে আমদানি শুল্কসহ প্রতিলিটার ডিজেলের মূল্য পড়ে ১৪২ টাকা ১৫ পয়সা। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে এই মূল্য আরও বাড়বে। বিপিসি মাসে ১৫টি জাহাজ বা পার্সেল তেল আনে। ফেব্রুয়ারি মাসে ৩০ হাজার টনের একটি জাহাজের তেলের মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ২২ মিলিয়ন ডলার। এখন ১৩৭ ডলার ব্যারেল ধরলে এই মূল্য গিয়ে ঠেকবে ৩০ মিলিয়ন ডলারে। সোমবার তেলের দাম ধরলেও দাম পরিশোধে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। যুদ্ধের কারণে তেলের মতো এলএনজি আমদানিতে বড় মাশুল দিতে হবে বাংলাদেশকে। প্রতি ইউনিট ১০ ডলারের এলএনজি সরকার গত সপ্তাহে গানবোর নামে একটি কোম্পানির কাছ থেকে কিনেছে ২৮ ডলারে।

ভারত থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল চাইবে সরকার : আগামীকাল বুধবার ভারতের ঢাকাস্থ হাইকমিশনারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমদু টুকুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সূচি রয়েছে। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ভারত থেকে প্রতিবছর ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির চুক্তি আছে। এখন বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার আরও ৮০ হাজার টন বেশি অর্থাৎ সর্বমোট ২ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব করবে ভারতকে। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের প্রতিমাসে ১৫ হাজার টন ডিজেল দেওয়ার কথা থাকলেও গত তিন মাসে দিয়েছে মাত্র ৫ হাজার টন। ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত নোমালিগড় পাইপলাইন দিয়ে এই তেল আনতে আগ্রহী বাংলাদেশ। নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, ভারতের হাইকমিশনারের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে ওই পরিমাণ তেল দিতে অনুরোধ করা হবে। সরকার মনে করে ভারত এই সংকটকালে চাহিদার তেল দেবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন. ভারত ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সোর্স থেকে আরও ৩ লাখ টন ডিজেল সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে অনেকে আগ্রহপত্র জমা দিয়েছে। বছরে ৭০ লাখ টন তেলের চাহিদা আছে। এর মধ্যে ডিজেল ব্যবহৃত হয় ৪০ লাখ টনের বেশি।

রেশনিং নিয়ে চাপে সরকার : জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমায় সরকার কয়েকদিন ধরে তেলের রেশনিং করছে। কিন্তু এতে করে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, রেলওয়ে, বিআইডব্লিউটিএ-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আপত্তি এসেছে। তারা বলছে, এতে করে নিয়মিত কাজ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী জ্বালানি বিভাগকে জানিয়েছে, এতে করে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে। তারা তেল না পেলে জেনারেটর এবং ফ্যাক্টরি চলবে না বলে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে। জ্বালানি বিভাগ এ ব্যাপারে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক করে একটি সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানা গেছে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গত রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, লাইটারেজ বা বিদেশগামী মালবাহী জাহাজগুলো তেলে চলে। সম্প্রতি সরকার এগুলোতেও তেল দেওয়ার ক্ষেত্রে রেশনিং শুরু করেছে। এতে করে পণ্য পরিবহণে সমস্যা হচ্ছে। কারণ চাহিদামতো তেল না পেলে জাহাজ ঠিকমতো চলতে পারবে না।