ভাগ্য বদলের আশায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার রিজিয়া বেগম ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। কিন্তু সেখানে দীর্ঘসময় কাজ করানো, কম খাবার দেওয়া এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর প্রায় পাঁচ বছর তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবার ভেবেছিলেন তিনি মারা গিয়েছিলেন কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুরুষ কর্মীর পাশাপাশি নারীরাও কাজের উদ্দেশ্যে যান। তবে বেশিরভাগই যান গৃহকর্মী হিসেবে। বিগত বছরগুলোতে নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার হার উদ্বেগজনক হারে কমেছে। ২০১৬ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর এক লাখেরও বেশি নারী কর্মী প্রতি বছর বিদেশ গেলেও টা নেমে এসেছে অর্ধেকে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন খাতে নারীদের সুরক্ষা নেই, ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নেই। তাই এখান থেকে আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
উদ্বেগজনক হারে কমেছে নারী অভিবাসন
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ১৯৯১ সাল থেকে নারী কর্মীরা বিদেশে যাওয়া শুরু করেন। তবে শুরুর দিকে বছরে মাত্র কয়েক হাজার নারী বিদেশে যেতেন এবং বিভিন্ন সময়ে সরকার সেটি বন্ধও করে দেয়। তবে ২০০৪ সাল থেকে নারীরা ধারাবাহিকভাবে বিদেশে যাওয়া শুরু করেন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর ২০১৫ সালে সৌদিআরবে নারী কর্মী পাঠানোর জন্য চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা রাতারাতি বছরে লাখ পেরিয়ে যায়। করোনা মহামারির দুই বছর বাদ দিলে ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গিয়েছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন, যা মোট অভিবাসীর প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে নারী অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৬১ হাজার ১৫৮ জন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অভিবাসনে নারীর অংশগ্রহণ ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
২০১৬ সাল নাগাদ, বাংলাদেশ থেকে মোট শ্রম প্রবাহের ১৬ শতাংশই ছিল নারী অভিবাসী কর্মী। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এক লাখেরও বেশী নারী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন। যদিও করোনার প্রভাবে ২ বছর এই সংখ্যা কিছুটা কমে গিয়েছিল, ২০২২ সালে এসে আবারও ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ নারী অভিবাসন করেছেন। তবে ২০২৩ সাল থেকে নারী অভিবাসীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সংখ্যা প্রায় ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। বিগত ৩ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক নিম্নমুখী প্রবনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণার তথ্য বলছে, অভিবাসীর দেশে শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, গৃহের অভ্যন্তরে নারীর প্রতি সহিংসতা নারী অভিবাসনকে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করছে।
রামরুর গবেষণা অনুযায়ী, গত দশ বছরে নারী অভিবাসন সম্পর্কে ব্যাপক নেতিবাচক রিপোর্ট উপস্থাপন, নারী অভিবাসনের ইতিবাচক গল্পের উপেক্ষাও এক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে। গার্মেন্টস শিল্প শুরু হয়েছিলো ৯০ শতাংশ নারী কর্মীদের নিয়ে। গত বছরগুলোতে ক্রমাগতভাবে নারীর অংশগ্রহণ কমতে কমতে এখন ৫৫ শতাংশে নেমেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে দায়ী করা হলেও রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীর গৃহের বাইরে কর্মে অংশগ্রহণকে পুনরায় সীমিত করছে কিনা তা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন আছে।
সাত বছরে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী
গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি হয়রানি ও নিপীড়নসহ নানা সংকট নিয়ে ফেরত এসেছেন অসংখ্য নারী। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন ফিরেছেন তার সঠিক তথ্য নেই। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরেই অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরে এসেছেন। এদের বেশিরভাগই নিপীড়নের নানা অভিযোগ করেছেন। করোনা মহামারি চলাকালে শুধু ২০২০ সালেই ফিরেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন।
বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র বন্দি বা ডিপোর্টি হিসেবে ২০১৯ সালে তিন হাজার ১৪৪ জন, ২০২১ সালে ১ হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ছয় হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে তিন হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে অন্তত ১ হাজার ৮৯১ জন দেশে ফিরেছেন। এর আগে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩৬৫ এবং ২০১৯ সালে অন্তত এক হাজার নারীর ফেরার তথ্য রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এই চার বছরে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ১৫ হাজারেরও বেশি নারী দেশে ফিরে এসেছেন।
এছাড়া অন্তত ৮০০ নারীর লাশ দেশে এসেছে। এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারী মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।
৮ বছরে লাশ হয়ে ফিরেছেন ৮০০ জন
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারীর মরদেহ কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফিরেছে। এদের অধিকাংশের মৃত্যু সনদে উল্লেখ আছে ‘আত্মহত্যা’। পরিবারগুলো বলছে, প্রতিটি মৃত্যুতেই কোনও না কোনও কারণ আছে।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন মোসাম্মৎ বেগম । সৌদি থেকে কীভাবে মিশরে গিয়ে তিনি মারা গেলেন সেই রহস্যের সমাধান হয়নি। মিশরের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়, ২৯ মে মিশরে ৫ তলা থেকে পড়ে মোসাম্মৎ বেগম নামে এক নারী গৃহকর্মী মৃত্যুবরণ করেন। বেগমের স্বামী আব্দুল আজিজ বলেন, বেশ কিছুদিন আগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জানতে পারেন, বেগম নামে এক নারী মিশরে মারা গেছেন। কিন্তু, তার স্ত্রী সৌদি আরবে থাকায় তিনি বিষয়টিতে গুরুত্ব দেননি। এরপর মিশর থেকে যখন তাকে ফোন করা হলো, তখন বুঝতে পারেন তার স্ত্রী মিশরে মারা গেছেন।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরবে যান আবিরুন বেগম। পরে গৃহকর্তার বাসায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর ৫১ দিন পর তার পরিবার এ খবর জানতে পারে। সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনা আবিরুনের মরদেহের সনদে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয় হত্যা। আবিরুনের পরিবারের সদস্যরা জানান, তার নিয়োগকর্তা আবিরুনের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। এমনকি দুই বছরে কোনও বেতনও তাকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু, এই ঘটনার কোনও বিচার হয়নি।
ফেরত আসা নারীদের অভিযোগ নির্যাতনের
দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীদের অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন, সেখানে তারা শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের অধিক কাজে নিয়োজিত থাকাসহ নানা সংকটে পড়েছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, ফেরত আসা নারীদের মধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেরা অন্তত ১২১ জন নারীকে তারা সেবা দিয়েছেন। এর বাইরে নানা ধরনের নিপীড়নের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন হাজারো নারী।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া নারীদের বড় একটি অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন, যার বেশিরভাগই যান সৌদি আরবে। তার মতে, সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া নারীদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—তারা আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে চরম ঝুঁকিতে থাকেন। এই ঝুঁকির কারণেই অনেক সময় তারা নিজেরা বা পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ খোঁজেন।
তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার পর অনেক নারী ভালো থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী নানা বিপদে পড়েছেন। অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরে এসেছেন, যাদের অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
শরিফুল হাসান বলেন, সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, তাদের সুরক্ষা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এ নিয়ে নানা নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়েছে। এর প্রভাব হিসেবে দেশের যেসব অঞ্চল থেকে আগে বেশি সংখ্যায় নারীরা বিদেশে যেতেন, সেসব জায়গায় এখন সেই সংখ্যা কমে গেছে। অর্থাৎ বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে মানুষের আগ্রহও কমেছে।
তার মতে, ঝুঁকি, আশঙ্কা ও সম্ভাবনা—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি খুব ইতিবাচক নয়। রাষ্ট্র নারীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মূলত শ্রমিক পাঠানোর দিকেই বেশি নজর দিয়েছে। বিদেশে পাঠানোর আগে যে যাচাই-বাছাই ও প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল, তা যথাযথভাবে করা হয়নি। আবার বিদেশে গিয়ে তারা বিপদে পড়লেও পর্যাপ্ত সুরক্ষা দেওয়া যায়নি। ফলে দক্ষতা উন্নয়ন করে নারীদের বিদেশে পাঠানোর যে একটি কাঠামো তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও গড়ে ওঠেনি। তার মতে, ভবিষ্যতে এই সংখ্যা খুব বেশি বাড়বে—এমন সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন না।
শরিফুল হাসান আরও বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগোচ্ছে, তাই গৃহকর্মী হিসেবে না পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে কেয়ারগিভার, নার্স বা গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে নারীদের বিদেশে পাঠানো যেতে পারে, যেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষা থাকে। তবু যদি রাষ্ট্র নারীদের বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক নারী সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের (বিএনএসকে) নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘অধিকার-সমতা-ন্যায়বিচার’-এর কথা বলা হলেও অভিবাসনের ক্ষেত্রে নারীরা প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার পান না। তার ভাষায়, এই খাতে নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের অবস্থা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
তিনি বলেন, নারীদের অভিবাসনে অনীহার একটি কারণ হলো বিদেশে কাজের অতিরিক্ত চাপ। যারা একবার বিদেশে কাজ করে ফিরে এসেছেন, তাদের অনেকেই আর যেতে চান না।
সুমাইয়া ইসলাম জানান, তাদের পর্যবেক্ষণে তিনটি প্রধান কারণ পাওয়া গেছে। প্রথমত, পারিবারিক কারণে অনেক নারী বিদেশে যেতে চান না; তারা বরং স্বামী বা ছেলেকে পাঠাতে চান। দ্বিতীয়ত, বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং সময়মতো বেতন না পাওয়া। তৃতীয়ত, কাজের অতিরিক্ত চাপ। এসব কারণেই নারীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।