Image description

চলমান যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে ইরানের ওপর ‘কঠোরতম’ আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেছেন, দেশটিতে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিত মৃত্যু’র বার্তা নিয়ে নতুন দফার হামলা চালানো হবে। তবে ওয়াশিংটনের এই চরম হুমকিকে কার্যত পাত্তা দিচ্ছে না ইরান।

হুমকিকে পাশ কাটিয়ে ইরান স্বাভাবিক জনজীবনে ফেরানোর সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার উচ্চঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তেহরান সরকার আজ রোববার থেকে সরকারি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়গুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা কোনো হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাবে। উভয়পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে পুরো অঞ্চল ঘিরে এক ধরনের অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে দফায় দফায় হামলা চালানো ইরানের প্রেসিডেন্ট গতকাল শনিবার প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে বলেন, সেসব দেশের মাটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা না হলে ইরানও তাদের ওপর হামলা করবে না। ইরানি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল ট্রুথ সোশ্যালে এক বার্তায় দাবি করেন, ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে নতি স্বীকার করেছে এবং ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে। ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরামহীন চাপের মুখেই ইরান তার প্রতিবেশীদের ওপর আর হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি শনিবার রাতেই ইরানে এক ভয়াবহ আঘাত হানার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেন।

হুমকি ও পাল্টা হুমকি: গতকাল ফ্লোরিডায় এক অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক অভিযানে ৪২টি ইরানি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী, ইরানে এমন সব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হবে, যা এর আগে কখনো বিবেচনা করা হয়নি। এমনকি তিনি ‘অনিশ্চিত মৃত্যু’ ও ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ মতো কঠোর শব্দ ব্যবহার করেছেন।

 
 
 

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ইরানের একজন কর্মকর্তা সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানি নাগরিকদের হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও এখন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত নতুন নতুন মার্কিন স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা এরই মধ্যে হাইপারসনিক ‘ফাতাহ’ এবং ব্যালিস্টিক ‘এমাদ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ চালিয়েছে।

স্বাভাবিক হচ্ছে ইরানের প্রশাসনিক কার্যক্রম: ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের মধ্যেও ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে দেশটির সরকার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে স্থবির হয়ে পড়া প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সচল করতে রোববার থেকে ২০ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তেহরানের প্রাদেশিক প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রাথমিক ধাপে পুরুষ কর্মীরা অফিসে কাজ শুরু করবেন এবং জরুরি সেবাগুলো আগের মতোই চালু থাকবে।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথেও স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে। এমিরেটস ও ইতিহাদ এয়ারলাইন্সের মতো বড় বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো সীমিত আকারে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। দুবাই থেকে কয়েক হাজার যাত্রী নিয়ে ফ্লাইটগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির কারণে অনেক দেশ এখনো তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে, তবুও এই সীমিত চলাচলকে স্বাভাবিকতার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও কূটনৈতিক তৎপরতা: মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, তারা তাদের আকাশসীমায় আসা একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। আইআরজিসি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে একটি মার্কিন স্যাটেলাইট যোগাযোগকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে, যদিও ইউএই কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।

উদ্ভূত পরিস্থিতে কূটনৈতিক তৎপরতাও দৃশ্যমান হচ্ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে সংলাপের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। তুরস্ক মনে করছে, দীর্ঘস্থায়ী কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।

ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক পরিস্থিতি: ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৬ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে মিনাব শহরে, যেখানে গত শনিবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ১৭৫ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট পির হোসেন কোলিভান্দ জানিয়েছেন, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর বেশিরভাগই ছিল ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, যার ফলে বেসামরিক ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ৬ হাজার ৬৬৮টি স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। লেবাননে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে; দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সেখানে ইসরায়েলের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন এক হাজারের বেশি মানুষ। অন্যদিকে, কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। এর বাইরে কুয়েতের নিজস্ব বাহিনীর দুই সেনাসহ আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ইরানের পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে গত ১ মার্চ বেইত শেমেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৯ জন মারা যান। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনজন, ওমানে একজন এবং বাহরাইনে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ওমান উপকূলে একটি তেল ট্যাংকারে হামলায় একজন এবং বাহরাইনের সালমান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে একজন প্রাণ হারান।

কোন দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি: মার্কিন প্রশাসন এই যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা দিলেও পেন্টাগন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেনি। ট্রাম্প অস্ত্র উৎপাদন চার গুণ করার ঘোষণা দিয়ে অভিযানের দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানও তাদের ‘প্রতিরোধ’ নীতি থেকে পিছু হটছে না। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ এবং হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তির ব্যবহার ইরানকে এই সংঘাতে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।

শেষ পর্যন্ত এই উত্তেজনা নিরসনে কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা হবে, নাকি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী ইরানের ওপর বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় নেমে আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে পুরো বিশ্ব। তবে ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কার মধ্যেও তেহরানের রাজপথ আর অফিস-আদালত চালুর প্রস্তুতি এক ভিন্ন গল্পের জানান দিচ্ছে—যেখানে সাধারণ মানুষ যুদ্ধের ভয়াবহতার চেয়েও জীবনকে স্বাভাবিক রাখার তাগিদকে বড় করে দেখছে।