Image description

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা ও চলমান সংঘাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। এমন আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতিমধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও এলএনজি’র মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তাদের মতে, নতুন সরকারের শুরুতেই বড় ধাক্কার মুখোমুখী। সব হিসাবনিকাশ ওলোটপালোট করে দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্সসহ অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যে ক্ষতি হবে তা কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। সংকট মোকাবিলায় বিকল্প খুঁজছে সরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেল ও এলএনজি গ্যাসের চাহিদা মেটাতে প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। অন্যদিকে এলএনজি’র ৪০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। কিন্তু ইরানের ড্রোন হামলার পর দেশটির কাতার এনার্জির উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে দেশটি। ফলে বিশ্ববাজারে এলএনজি’র দরও বাড়ছে হু-হু করে। জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের অন্যতম সমুদ্রপথ হচ্ছে হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে ওমান উপসাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে জাহাজ আসে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করায় সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠবে।
সূত্র বলছে, প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালী ব্যবহার করে পরিবহন করা হয়।

নতুন ব্যয় বাড়বে: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে এবং উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন করে দেখা দেয়া এই সংকটের কারণে জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইউরোপের ২৭ দেশে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এসব কারণে নতুন রপ্তানি আদেশ ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়লে পশ্চিমা দেশগুলোর ভোক্তারা তাদের বিলাসদ্রব্য ও পোশাক কেনা কমিয়ে দেবে। এতে প্রধান দুই বাজারে রপ্তানি কমে যেতে পারে আশঙ্কাজনক হারে।

শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স হ্রাসের শঙ্কা: এদিকে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থা বিরাজ করলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাকরির বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা তুলনামূলক কম বেতনে কাজ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে দেশগুলোতে নতুন করে শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে। এতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির যতটুকু স্বস্তি বিরাজ করছে, তার বড় কারণ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এসব দেশে প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে রেমিট্যান্সে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমদানি-রপ্তানি নিম্নমুখী: টানা সাত মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। আর এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা। তারা বলছেন, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অস্থিরতার কারণেই রপ্তানি আয় কমছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আয় আরও কমবে। এতে অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা ও রপ্তানিকারক।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারি পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ (৩.৪৯ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যা গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১২.০৩ শতাংশ কম। আর আগের মাস জানুয়ারি চেয়ে কম প্রায় ২১ শতাংশ।
তথ্য বলছে, যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স কমলে রিজার্ভও কমবে। এতে দেশের অর্থনীতি আরও সংকটের মধ্যে পড়বে।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, হরমুজ প্রণালী একটি সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। কারণ হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের উত্তেজনা, অবরোধ বা যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি খরচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ের চাপ বাড়ে এবং চূড়ান্তভাবে পোশাকের উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক বেড়ে যায়।

নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত সাত মাস ধরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বের রপ্তানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা খাচ্ছে। জানি না এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে; আমাদের কী হবে? কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের?”

অনিশ্চয়তায় প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য: এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সমুদ্র বা আকাশ-কোনো পথেই কার্যত পণ্য যাচ্ছে না। ফলে আমদানি-রপ্তানি দুই দিকেই তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা।

যুদ্ধের কারণে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বেশকিছু পণ্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পড়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ৬০০ কন্টেইনার রপ্তানি পণ্য আটকে আছে বলে জানান শিল্প গ্রুপটির পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল। তিনি বলেন, নতুন করে রপ্তানির ক্রয়াদেশও আসছে না। রপ্তানির পাশাপাশি আমদানিও বন্ধ রয়েছে।

বিকল্প উৎসের উদ্যোগ: দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও সংকট মোকাবিলায় সরকারও পরিকল্পনা নিয়েছে। সংকট তৈরি হলে বিকল্প উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির কথা ভাবা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমাদের জ্বালানির সরবরাহ চেইনের আপাতত কোনো আশঙ্কা নেই। যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আমাদের জ্বালানি আমদানিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। সেই সংকট মোকাবিলায় আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা নিচ্ছি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুদ্ধের ব্যাপ্তি বড় আকার ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে তা ছড়িয়ে পড়েছে। কতোদিন এই যুদ্ধ চলবে, তা বোঝা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে অসুবিধা হচ্ছে। জ্বালানি দুশ্চিন্তাও সামনে বড় হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, সংকটের সমাধান খুব দ্রুত হবে না বলেই মনে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে চললে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করবে। এখন হয়তো তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মজুত আছে। নতুন আমদানি না হলে সেটি ফুরিয়ে যাবে। আবার এলএনজির দাম বাড়ছে। তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দ্রুতই ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা উচিত তিনি মনে করেন তিনি।