রাজধানীর চাঁনখারপুলের একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সিনিয়র নার্স নাহিদা আক্তার ববির (২৯) নিথর দেহ।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দিবাগত রাতে ফ্যানের সাথে ওড়নায় ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। তবে এটি কেবল একটি সাধারণ আত্মহত্যা নয়, বরং স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ধারাবাহিক পৈশাচিক নির্যাতনের এক করুণ পরিণতি বলে অভিযোগ উঠেছে। আত্মহত্যার আগে লিখে যাওয়া নাহিদার তিনটি চিরকুট এখন তার ওপর হওয়া অমানবিক অত্যাচারের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিরকুটে ‘মরণোত্তর জবানবন্দি’:
মৃত্যুর আগে নাহিদা আক্তার তার যন্ত্রণার কথা চিরকুটে লিখে গেছেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে তার স্বামী ইলিয়াস, শাশুড়ি, ননদ সুমি এবং স্বামীর পাতানো চাচা মো. শওকত হোসেনকে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন। নাহিদা লিখেছেন যে, ইলিয়াস এবং শওকত হোসেনের মানসিক অত্যাচারে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন । তাকে বাসায় "কুকুরের মতো" মারধর করা হতো এবং সবসময় মানসিক চাপে রাখা হতো। নাহিদার ভাষায়, "সবসময় আমাকে বলতে পারছিস কেন চলে যা, তোর সাথে সংসার করতে চাই না" ।
স্বামীর পরকীয়া ও শ্বশুরবাড়ির মদত:
নাহিদার অভিযোগে বেরিয়ে এসেছে স্বামী ইলিয়াসের চারিত্রিক স্খলনের ভয়াবহ চিত্র। তিনি চিরকুটে উল্লেখ করেছেন যে, ইলিয়াস বিভিন্ন সময় বাইরে রাত কাটাতেন এবং নাহিদাকে অবজ্ঞা করে বলতেন যে তিনি "১০০ মেয়ের সাথে রাত কাটাতে পারেন"। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অনৈতিক কাজে ইলিয়াসের মা এবং বোন তাকে সহযোগিতা করতেন এবং লোকমুখে বলতেন যে ইলিয়াসের ডিভোর্স হয়ে গেছে । নাহিদা আরও অভিযোগ করেছেন যে, পাতানো চাচা শওকত হোসেন ইলিয়াসকে বিভিন্ন মেয়ের কাছে নিয়ে যেতেন এবং নাহিদাকে ফোনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও বাসায় এসে হুমকি-ধামকি দিতেন ।
পুরানো ক্ষতে নতুন আঘাত:
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে বিয়ের পর থেকেই নাহিদার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতনের দায়ে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নাহিদা মামলা করলে ইলিয়াস জেলও খাটেন। পরে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে তারা পুনরায় সংসার শুরু করলেও নির্যাতনের মাত্রা কমেনি, বরং বেড়েছে। নাহিদা তার চিরকুটে লিখে গেছেন যে, আলমারিতে ইলিয়াসের পরকীয়ার অনেক প্রমাণ ও ছবি রাখা আছে । তিনি মৃত্যুর আগে বিচার চেয়ে লিখে গেছেন, "আমি চাই তাদের উপযুক্ত শাস্তি হোক, যেন আর কোন মেয়ের জীবন না নষ্ট হয়"।
তদন্ত ও বর্তমান অবস্থা:
পুলিশ জানায়, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠান। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী ইলিয়াস পলাতক রয়েছেন। চকবাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. কাউছার জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত চিরকুটটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং পলাতক আসামিদের ধরার চেষ্টা চলছে। সিরাজগঞ্জ সদর রেলওয়ে কলোনির মেয়ে নাহিদার এমন অকাল মৃত্যুতে তার পরিবার ও সহকর্মীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের পরিবার এই ঘটনায় একটি হত্যা প্ররোচনা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।