আগামী ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন। প্রথম দিন থেকেই সরকারকে কীভাবে চাপে ফেলা যায়, সে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যু, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নির্বাচনে অনিয়ম, জুলাই সনদ ও গণভোট এবং সুশাসনের প্রশ্নে বিরোধী দলের তোপের মুখে পড়তে হতে পারে সরকারি দলকে। এর মধ্যে মূল ফোকাস থাকবে আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচনে অনিয়ম এবং জুলাই সনদ ও গণভোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদল এবং নতুন মুখের আগমনের খবরের মধ্যেই সংসদের এই অধিবেশন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধী দল যদি ঐক্যবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে অধিবেশনের শুরু থেকেই সংসদ প্রাণবন্ত ও কিছুটা উত্তপ্ত থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বিরোধীদলীয় নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, রাজপথের পরিবর্তে সংসদ অধিবেশনের শুরু থেকেই তারা সরকারের বিভিন্ন ত্রুটি চিহ্নিত করে সরব থাকবে। এরই মধ্যে জামায়াতের সংসদ সদস্যদের নিয়ে দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা হয়েছে। গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রথমবার নির্বাচিতদের সংসদীয় কার্যক্রম, বিল-বাজেট, স্থায়ী কমিটির কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। ‘ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম’ শিরোনামে ওই কর্মশালায় অভিজ্ঞ সাবেক আমলা, একাডেমিশিয়ান ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে এমপিদের দায়িত্ব ও বিরোধী দলের কৌশলগত ভূমিকা কেমন হবে, তা তুলে ধরা হয়।
পাশাপাশি দলটির নেতারা বলেছেন, সরকারের সব ইতিবাচক পদক্ষেপে বিরোধী দলের পূর্ণ সমর্থন থাকবে। কিন্তু সরকার কোনো অসংগত বা জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিলে প্রথমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। সংশোধন না হলে বিরোধী দলের যে ভূমিকা, সেটিই পালন করা হবে। এককথায় জনগণের মৌলিক অধিকারের পক্ষে সরব থাকবে বিরোধী দল।
বিরোধী দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, সংসদ হচ্ছে জনগণের কথা বলার জায়গা। তারা চান সরকার প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক জবাব দিক। দেশ ও জনগণের স্বার্থ এবং জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ বিরোধী দল দেবে না।
অবশ্য বিরোধী দল সংসদে নানা বিষয় উত্থাপন করবে, এমনটা বিবেচনায় রেখে সরকারি দলও এ বিষয়ে প্রস্তুত বলে জানা গেছে। বিরোধী দলের ‘চাপ’ মোকাবিলায় সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধীদের অভিযোগ খণ্ডন করেন। সংসদ নেতা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সংসদীয় রীতি মেনেই সব প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত বলে জানানো হয়েছে। এ জন্য বিএনপি আজ শুক্রবার এবং আগামীকাল শনিবার তাদের সংসদ সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৭ আসনের ফল গেজেট আকারে ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ৬৮টি। বাকি আসনগুলোতে বিভিন্ন জোট, দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন কখনো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি। তার মধ্যে বিরোধী দল জামায়াতের ৮০ ভাগ সংসদ সদস্য একেবারেই নতুন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এর দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। সংবিধানে বলা আছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ আহ্বান করা হবে।’ এখন সংসদ নির্বাচনের এক মাসের মাথায় আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ডেকেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ওই দিন বেলা ১১টায় সংসদের বৈঠক শুরু হবে। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন। সাধারণত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন দীর্ঘ হয়। প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা; অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন; শোক প্রস্তাব ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ থাকার কথা রয়েছে। অধিবেশনজুড়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা করবেন সংসদ সদস্যরা।
১১-দলীয় জোটের কয়েকজন সংসদ সদস্য আলাপকালে কালবেলাকে জানান, যেহেতু সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাছে, তাই পরিস্থিতি বুঝে ইস্যুভিত্তিক আলোচনা হবে। তবে তাদের মূল ফোকাস থাকবে দেশ ও জনগণের স্বার্থ। বিশেষ করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে প্রথমেই সংসদের বক্তব্য দেবেন তারা। এরপর ক্রমান্বয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট ইস্যুতে আদালতে রিট আবেদন নিয়ে এ বিষয়ে সরকারি দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যক্রম, বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট ও সরকারি দপ্তরের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। জননিরাপত্তা তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও মানবাধিকার ইস্যুতেও কথা বলবে বিরোধী দল জামায়াতসহ এনসিপি।
জানতে চাইলে পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জানতে চাইব। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জননিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলাসহ দেশ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কথা বলব। সর্বোপরি, সরকারি দল তাদের ভূমিকা পালন করবে, আমরা বিরোধী দল হিসেবে যৌক্তিক বিষয়গুলো তুলে ধরব।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের অভিযোগ করে বলেন, ‘জালিয়াতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন আসনে ভোট গণনায় অতিরিক্ত দেরি, পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া ফল প্রকাশ, ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর, এমনকি পেনসিল দিয়ে ফল লেখাসহ বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে।’ এসব বিষয় নিয়ে প্রথম অধিবেশন থেকেই সংসদে কথা বলবেন তারা।
এদিকে সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদ্য সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে বলে দাবি করেছে জামায়াত। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে দলের নায়েবে আমির ও বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘আমরা একটা রাজসাক্ষী পেয়েছি। সেই রাজসাক্ষীর নাম হচ্ছে সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান। তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে এটা প্রকাশ করেছেন, তার ভাষায়—যারা নারীদের উপযুক্ত অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারেনি, তারা বিরোধী দলে থাকলেও আমরা কিন্তু তাদের মূলধারায় বা প্রধান শক্তি হিসেবে আসতে দিইনি। তখনই বোঝা যায়, যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা এসেছে, সেটাকে উনি নিজেই স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন। সুতরাং আমি এই সরকারের কাছে দাবি জানাব, রিজওয়ানা হাসানকে তারা কীভাবে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনবেন এবং আওতায় এনে পরিষ্কার যে সিচুয়েশন তিনি তৈরি করেছিলেন, সে সম্পর্কে ওনারা জানবেন, আমাদের জানাবেন, দেশবাসীর কাছেও এটা পরিষ্কার করবেন।’
অন্যদিকে জুলাই সনদ ও গণভোট বাতিল চেয়ে আদালতে রিট করার বিষয়টি নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ বিরোধী দল। দলটির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে, মাত্র কয়েকটি ভিন্নমত ছাড়া। যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জারি করা হয়েছে, সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ আদেশ জারি করেছেন।’ এ আদেশটিকেও তারা (সরকারি দল) সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করছেন।
তিনি বলেন, ‘কেন শুধু গণভোট বাতিলের দাবি উঠছে? কেন জাতীয় নির্বাচন বাতিলের দাবি উঠছে না? মাঝখানে আরও ১৩৫টি অধ্যাদেশ রয়েছে, সেগুলোর কী হবে? তাহলে কি আমরা আবার ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাব? সুতরাং একটি বিপ্লব-পরবর্তী চার্টারকে অপ্রাসঙ্গিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তা হবে রাজনৈতিক ও আইনি ভুল। বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করা সঠিক নয়। অতীতে আদালতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে, যা বুমেরাং হয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এর সমাধান হওয়া উচিত।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দলের এক ইফতার মাহফিলে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘চব্বিশের ৩৬ জুলাই ছাত্রজনতার বিপ্লবে আমরা দলমত নির্বিশেষে সবাই শামিল হয়েছিলাম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে। সরকার ও সংসদের কাছে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা। আমরা গতানুগতিক বিরোধী দল হিসেবে এই সংসদে কাজ করতে চাই না। আমরা চাই এই সংসদ হোক অর্থবহ। জনগণের সব চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্র। সরকারি দল তারাও যেমন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন, আমরাও বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চাই।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘সরকারের সকল সংগত পদক্ষেপে আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় আমরা যদি দেখি সরকার কোনো অসংগত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়েছে, আমরা প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করব। সরকার আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে জাতি উপকৃত হবে, আমরা কৃতজ্ঞ হবো। সরকার পরামর্শ গ্রহণ না করলে বিরোধী দলের যে ভূমিকা সেটিই আমরা পালন করব।’
জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি কালবেলাকে বলেন, ‘যৌক্তিক দাবি ও ইস্যুতে বিরোধী দল সমালোচনা করবে ও সরকারকে চাপে রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা প্রত্যাশা করি তাই। সরকারের একটা অন্যতম প্রধান কাজ হলো জাতীয় সংসদের বিরোধী দলকে শক্তিশালী করা; শক্তিশালী রাখা, যেন সরকার ‘ইন-ট্র্যাক’ থাকে এবং ভালো কাজ করতে পারে। সংসদকে কার্যকর রাখতে হলে গঠনমূলক আলোচনার বিকল্প নেই। আমরা যে কোনো যৌক্তিক বিতর্ক স্বাগত জানাতে এবং সংসদীয় রীতি মেনেই সব প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত।’