দুপুর ২টায় রাজধানী শাহবাগের বারডেম হাসপাতালের সামনে টিসিবি’র ট্রাকের পাশে ক্লান্ত হয়ে বসেছিলেন আয়েশা বেগম। রোজা রেখে টানা তিনঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টোকেন পাওয়ার পর রাস্তার পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার খরচ সামলাতে সাশ্রয়ের আশায় পাশের বাসার ভাড়াটিয়া কুলসুমকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।
আয়েশা বেগম বলেন, আমার স্বামী দু’দিন ধরে অসুস্থ। কিছু টাকা বাঁচাতে এখানে এসেছি। তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে টোকেন পেয়েছি। এখন কুলসুম আপাকে বলেছি আমার পণ্যগুলো নিতে। যে টাকা সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে স্বামীর ওষুধ কিনবো। শুধু আয়েশা নন এমন শত শত মানুষকে ভীড় টিসিবির ট্রাকের পেছনে।
রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে বিক্রির লক্ষ্যে ১৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রাক সেল কর্মসূচি শুরু করেছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), চলবে ১২ই মার্চ পর্যন্ত। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ, শান্তিনগর, শাহজাহানপুর, উত্তরা, ফকিরাপুলসহ রাজধানীর ৫০টি স্থানে ট্রাকে পণ্য বিক্রি করেছে টিসিবি। টিসিবি’র সারিতে নিম্নআয়ের মানুষের দাঁড়ানোর কথা থাকলেও দেখা গেছে এই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাও। এই ভিড়ের কারণ হলো- টিসিবি’র ট্রাক থেকে পণ্য কিনলে ৩৫০ টাকার মতো বাঁচবে।
টিসিবি’র ট্রাকে ২৫০ জন মানুষ পণ্য কিনতে পারেন সাধারণত। টিসিবি বর্তমানে সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর- এই পাঁচটি পণ্যের একটি প্যাকেজ ৫৯০ টাকায় বিক্রি করছে।
সরজমিনে ঢাকার টিসিবি’র পণ্য বিক্রির একাধিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেলা ১১টার দিকেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় টিসিবি’র ট্রাকে পণ্য বিক্রির গাড়ি আসে। আগেই সেখানে অপেক্ষা করছিলেন ক্রেতারা। টিসিবি’র গাড়ির পেছনে ছিলো নারী-পুরুষের লম্বা লাইন। নারী-পুরুষ আলাদা লাইন হলেও নারীদের লাইনেই ছিলো সবচেয়ে বেশি ক্রেতা। সবার হাতে মার্কার কলম দিয়ে ক্রম নম্বর লেখা। লাইনে দাঁড়ালেও সবাই চেষ্টা করছিলেন সিরিয়াল ভেঙে আগে পণ্য কিনতে। রমজান মাস। দুপুরের দিকে কড়া রোদ। রোদের মধ্যেই দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। তাদের মধ্যে একেকজন একেক পেশার। পুরুষদের মধ্যে অনেকেই ছিল চাকরিজীবী।
ট্রাক সেল কর্মসূচির আওতায় টিসিবি’র ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর কিনতে পারেন। এর মধ্যে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম রাখা হচ্ছে ১১৫ টাকা। এ ছাড়া প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ৭০ টাকা, ছোলা ৬০ টাকা এবং আধা কেজি খেজুরের দাম ৮০ টাকা। সব মিলিয়ে এসব পণ্য কিনতে একজনের লাগে ৫৯০ টাকা। বাজার থেকে সমপরিমাণ পণ্য কিনতে প্রায় ৯৫০ টাকা লাগে। অর্থাৎ, প্রায় ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ টাকা সাশ্রয় হয়।
শাহবাগ এলাকায় শিমু আক্তার নামের আরেকজন ভোক্তা বলেন, বাসায় তেল, ডাল শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাজার কেনা লাগতো অন্যদিকে আমার বোনের স্বামী অসুস্থ তাই আমার বোনের সঙ্গে এসেছি। আমার বোনও কিনবে। এখানে কম দামে বাজার কিনতে পারছি তাই একটু অপেক্ষা করে হলেও নিতে হচ্ছে। দোকান থেকে কিনলে ৩০০ টাকা বেশি লাগতো।
টিসিবি’র ট্রাক দেখে লাইনে দাঁড়ান কলেজ শিক্ষার্থী নাইমুল, জনি ও সাকিব। তারা মেসে থাকেন এবং টিউশনি করে খরচ চালান। নাইমুল বলেন, পিজি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসে দেখি এখানে কম দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ছোলা এখানে ৬০ টাকা, অথচ বাজারে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রায় ৬০০ টাকায় প্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছি। এতে কিছু টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। আমরা টিউশনি করে ঢাকায় থাকি তাই এখানে কিছু টাকা সাশ্রয় হলে সেই টাকা দিয়ে অন্য বাজার কেনা যাবে।
বেসরকারি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, মাসে বেতন পাই ২২ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। বাজার করতেই অর্ধেক টাকা শেষ হয়ে যায়, বাকি বাসাভাড়া, গাড়িভাড়া তো আছেই। যদি টিসিবি পণ্য পাই তাহলে সাশ্রয় হওয়া টাকা দিয়ে সংসারের জন্য অন্য কিছু কিনতে পারবো।
শাহবাগের মতো ফকিরাপুল পানির পাম্প ও যাত্রাবাড়ী কাজলা এলাকায় টিসিবি’র ট্রাকের পেছনেও দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পণ্য বিতরণে হিমশিম খেতে হয়েছে ট্রাকে দায়িত্বরত কর্মচারীদের। এখানে বিকাল ৩টায় শেষমুহূর্তে কাজলা এলাকায় টিসিবি’র পণ্য নেয়ার জন্য হুড়োহুড়ি করছিলেন রিকশাচালক আলমগীর। হাতে টিসিবি’র পণ্য পেয়ে তৃপ্ত হাসি তার মুখে।