Image description

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি তেলের সংকট বা দাম বাড়তে পারে- এই শঙ্কায় পাম্পে ভিড় করছেন যানবাহন মালিক ও চালকরা। শঙ্কা থেকে বাড়তি জ্বালানি নিতে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে ভিড় দেখা গেছে। সরকারের তরফে বলা হচ্ছে এই মূহূর্তে জ্বালানির সংকট নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি সরবরাহ সাশ্রয়ে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সরজমিন একাধিক তেলের পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো পাম্পে তেল নিতে দীর্ঘ লাইন হয়ে আছে। সকাল থেকেই মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ সারি ও ভিড় দেখা গেছে পাম্পগুলোতে। চালকদের বেশির ভাগই ট্যাঙ্ক ভর্তি করে জ্বালানি কিনে নেন। এরফলে ঢাকায় দু’টি জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখতেও দেখা গেছে। এছাড়া কোথাও কোথাও খোলা ড্রাম বা বোতলে ডিজেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। সকালের দিকে জ্বালানি বিক্রয়কারী প্রতিনিধিরা জানান, বেশির ভাগ ক্রেতা ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে জ্বালানি নেয়ায় পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ কমে গেছে। বন্ধ হওয়া পাম্প কর্তৃপক্ষ জানান, জ্বালানি সরবরাহে স্বল্পতার কারণেই কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়।

শাহবাগ এলাকার মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারের ক্যাশিয়ার মানবজমিনকে বলেন, আমাদের এখানে সারা বছরই ভিড় থাকে। গাড়ির লাইন সবসময় বড় থাকে। তবে, রমজানে আমাদের বিক্রি বেশি হয়। বিশেষ করে ইফতারের আগের সময়টাতে সবচেয়ে বেশি। ওই হিসাবে আজও (বৃহস্পতিবার) গাড়ির লম্বা লাইন রয়েছে। ওই পাম্পের বিক্রয়কর্মী বলেন, লাইন আগের মতো হলেও, আজ ক্রেতারা বেশি বেশি করে জ্বালানি তেল কিনছেন।

বাংলামোটর এলাকার পূর্বাচল ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী সাইফুল মানবজমিনকে বলেন, সকালের সময় বেশ ভালো চাহিদা ছিল তেলের। তবে সন্ধ্যা বাড়ার সঙ্গে কিছুটা কমে গেছে। সকালে চাহিদা বাড়ার কারণ তেল সংকটের আশংকা-ই কিনা এই বিষয়ে নিশ্চিত নন সাইফুল।

ঢাকা কলেজের সামনের মেঘনা মডেল সার্ভিসের একজন কর্মচারী বলেন, সব সময়ে মানুষ গাড়িতে যতটুকু তেল প্রয়োজন ততটুকুই তেল নেয়। কিন্তু গতরাত থেকে অনেকেই ট্যাংকি পূর্ণ করে নিচ্ছেন। এতে পাম্পে ভিড় বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পরে তাই পাম্পে আর তেল নেই। এখন আবার রাতে গাড়ি এলে সেটি ভরা হবে।

ডিজেল বিক্রি বন্ধ রাখার বিষয়ে সকালে মিরপুর এলাকার স্যাম এসোসিয়েটস পাম্পের ক্যাশিয়ার শরীফ আহমেদ বলেন, পাম্পে সাধারণত ২০ থেকে ২৭ হাজার লিটার জ্বালানি মজুত থাকে। সেটা এখন প্রায় ৫ হাজারে নেমে এসেছে। ডিজেল প্রায় শেষের দিকে। তাই খোলা বিক্রি বন্ধ রেখে শুধু যানবাহনে দিচ্ছি। কারণ যানবাহনটা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চালকদের ধারণা, দুই-একদিনের মধ্যেই পেট্রোলের দাম বাড়তে পারে। তাই আগেভাগেই বর্তমান দামে বেশি করে তেল কিনে রাখছেন তারা। অন্যদিকে পাম্পের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য দাম বৃদ্ধির আতঙ্কে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি তেল নিচ্ছেন। নিজের মোটরসাইকেলে পেট্রোল নিতে আসা মনির হোসেন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম বাড়তে পারে বলে শুনেছি। তাই আজ একটু আগে থেকেই কম দামে তেল নিতে এসেছি। ফুল ট্যাংক করে তেল নিয়ে গেলাম। প্রাইভেটকার চালক জয়নাল আবেদীন বলেন, গাড়ির মালিক আমাকে বলেছেন তেলের দাম বাড়তে পারে, তাই বেশি করে তেল নিয়ে আসতে। সেই কারণে পাম্পে এসেছি। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এখনো আমার সিরিয়াল আসেনি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, আজ (বৃস্পতিবার) স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তেলের বিক্রি অনেক বেড়েছে। আজকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ হারে তেল বিক্রি হয়েছে। যা গতকাল ছিল ৬০ শতাংশের মতো। তিনি বলেন, অযথা মানুষ উত্তেজনা ছড়িয়ে বাড়তি তেল কিনে সংকট তৈরি করছে। এইভাবে তেল কিনে নিয়ে গেলে যার জন্য তেল কেনা জরুরি ছিল সে তেল পাবে না। প্রত্যেকটি পাম্পে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়। এখন হুট করে যদি সবাই বাড়তি তেল কিনতে থাকে তাহলে তেল সংকট হওয়া স্বাভাবিক।

বিপিসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করবো। শুধু চলতি মাস নয়, আগামী জুন পর্যন্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। পরিশোধিত তেল যেসব উৎস থেকে আসবে, ইরান যুদ্ধের কোনো প্রভাব নেই ওইসব অঞ্চলে। এগুলো আসবে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। বর্তমানে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেড ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে ২রা মার্চ পর্যন্ত ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।