ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলা মোকাবিলা জোরদার করেছে ইরান। শত্রুর ঘাঁটিতে কঠোর হামলার অঙ্গীকার করেছে দেশটি। গতকাল ইরানের খাতাম আল আম্বিয়া কেন্দ্রীয় দপ্তরের ডেপুটি কমান্ডার জেনারেল কিওমারস হেইদারি বলেছেন, তার দেশ লক্ষ্য পূরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তীব্র আঘাত না হানা পর্যন্ত এই যুদ্ধ ত্যাগ করবে না।
২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরান। ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিব ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সম্পদ ও ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। এখন পর্যন্ত ইরানের সমর্থনে সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে লেবাননের হিজবুল্লাহ। উভয়ে মিলে তেল আবিবে হামলা জারি রেখেছে। আকাশপথে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন পানিতেও গড়িয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের উত্তেজনা আছড়ে পড়েছে ভারত মহাসাগরে। অন্যদিকে সাইপ্রাসে রণতরী পাঠিয়েছে ফ্রান্স। যুক্তরাজ্যও সেখানে অ্যান্টি মিসাইল সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। জার্মানি সরাসরি হাজির না হলেও মৌন সম্মতি দিয়ে রেখেছে। ইউরোপের এই তিন সুপার পাওয়ার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। শেষে তাদের কাছে ওয়াশিংটনকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। বুধবার ভারত মহাসাগরে অবস্থান করা ইরানের জাহাজে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পক্ষান্তরে ইরানও বৃহস্পতিবার একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
দেশটির বিপ্লব রক্ষাকারী বাহিনী আইআরজিসি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের সমর্থন করা কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দেয়া হবে না। এদিকে ইরান ও হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা আরও জোরদার হয়েছে। স্কুল ও হাসপাতালেও হামলা হচ্ছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, গত শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত অন্তত ১০৫টি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিশাহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিপুল পরিমাণ মানুষ ইতিমধ্যেই তেহরান ছেড়ে গিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, যুদ্ধের প্রথম দুইদিনেই তেহরান ছেড়েছে লক্ষাধিক মানুষ।
তিন দেশের ২০ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা: ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচের তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত এসব মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলায় সেগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নতুন অংক কষছেন ট্রাম্প: ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করার সময় তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন করা। এই লক্ষ্য হয়তো এখন কাগজে-কলমে আছে। তবে ওয়াশিংটন থেকে আসা সামপ্রতিক সব বার্তায় যে ইঙ্গিত মিলছে তাতে দেখা যাচ্ছে, আগের অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সরে এসে এখন নতুন করে হিসাবনিকাশ করতে হচ্ছে তাদের। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, এই অভিযানের ফলে ইরানের ভেতরে শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য যে জনরোষ বা অস্থিরতা তৈরি হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তেমনটি ঘটেনি। উল্টো পাঁচদিনে গড়ানো যুদ্ধ গোটা অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাও স্থিতিশীল আছে, এমনকি ইরান শত্রুপক্ষের বিভিন্ন অবস্থানে পাল্টা আঘাতও হেনে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরনো হিসাব নতুন করে মেলাতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং তেহরানের আলোচনার প্রস্তাব মানার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের আগের ধারণা এখন আর খাটছে না। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরানও আলোচনার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না।
তাছাড়া, আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতায় ইরানের প্রতিক্রিয়া অনেকটা শীতল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আক্রোশবশত কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এক্সে দেয়া এক পোস্টে আব্বাস আরাগচি এই মন্তব্য করেন। তিনি যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের তথাকথিত আলোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেন। বলেন, তথ্যের বিকৃতি পরমাণু আলোচনাকে ব্যর্থ করেছে। ট্রাম্প শুধু কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, তিনি তাকে নির্বাচিত করা আমেরিকান জনগণের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
কোন দেশে কতো নিহত: যুদ্ধ শুরুর পর হতাহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাতহত হয়েছেন ইরানে। আল জাজিরার তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানে ১২৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মিনাবের একটি বিদ্যালয়ে গত শনিবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শিক্ষার্থীসহ ১৭৫ জন নিহত হন। ইসরাইলে এখন পর্যন্ত ১১ জন নিহত হয়েছেন বলে স্বীকার করেছে। এর মধ্যে ১লা মার্চ ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলের বেইত শেমেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৯ জন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের নিহতের সংখ্যা ছয়। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় তারা নিহত হন। এ ছাড়া সোমবার থেকে ইসরাইলি হামলায় লেবাননে কমপক্ষে ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের হামলায় দুই কুয়েতি সেনাসহ চারজন নিহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহতের সংখ্যা তিনজন। ওমানের উপকূলের কাছে একটি ট্যাংকারে হামলায় একজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। বাহরাইনের সালমান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক ব্যক্তি নিহত হন।
ট্রাম্পের যুদ্ধের লাগাম টানার প্রচেষ্টা ব্যর্থ: ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন, তার লাগাম হাতে নিতে আনা একটি প্রস্তাব পদ্ধতিগত ভোটের পর্যায়েই খারিজ করে দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন উচ্চকক্ষ সিনেট। যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ কংগ্রেসের হাতে নিতে আনা এ প্রস্তাবটি বুধবার ৪৭-৫২ ভোটে খারিজ হয়ে যায় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। একজন বাদে রিপাবলিকানরা সবাই প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, সঙ্গে পেয়েছেন এক ডেমোক্রেটকে। এর ফলে ট্রাম্পের সামরিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা যেমন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো, তেমনি রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাও যে ইরান যুদ্ধে প্রেসিডেন্টকেই সম্পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন তা স্পষ্ট হলো।