Image description

স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘শিবির সাজ্জাদকে’ চাঁদা না দেওয়ায় তার বাসায় গুলির ঘটনা ঘটেছে। এটি ওই বাসায় দ্বিতীয় দফায় গুলির ঘটনা। এর আগে এক দফা তার বাসায় গুলি করা হলে পুলিশি পাহারা বসানো হয়।

 

নগর পুলিশের একটি সূত্র বলছে, বিদেশে বসে সাজ্জাদ আলী ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের দিয়ে তার চাঁদাবাজির কার্যক্রম চালান। এই ক্ষেত্রে টার্গেট ব্যবসায়ীকে সাজ্জাদ ফোন করেন। চাঁদা না পেলে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের দিয়ে গুলি ছোড়ান। এ ক্ষেত্রে সাজ্জাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মী বা সন্ত্রাসী নেই। শহরজুড়ে গড়ে ওঠা সব কিশোর গ্যাং ও অভ্যাসগত অপরাধীদের সাজ্জাদ ব্যবহার করেন। এই কারণে তার চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা কঠিন। তবে এই চক্রকে থামানোর জন্য অভ্যাসগত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

 

পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছেন। ওই তালিকায় তার নাম সাজ্জাদ খান। মাঝে দীর্ঘ সময় সাজ্জাদ খানের চাঁদাবাজি বন্ধ থাকলেও ৫ আগস্টের পর আবার দৃশ্যপটে ফেরেন তিনি।

 

চট্টগ্রামের আলোচিত ‘এইট মার্ডার’ মামলার আসামি সাজ্জাদ হোসেন খান ও হাবীব খান। বিদেশে বসে দ্বিতীয় স্তরের মাধ্যমে লক্ষ্য স্থির করে তৃতীয় স্তরের মাধ্যমে ভয়ের এই ব্যবসা চালু রেখেছেন তারা।

 
 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দ্বিতীয় স্তরে আছে কিছু হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল। যাদের কাজ তথ্য সরবরাহ ও নেটওয়ার্কিং। এই স্তরে খোদ পুলিশের কিছু সদস্য এমনকি সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন জড়িত। যাদের কাজ হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ। আর তৃতীয় স্তরে কিলার গ্রুপ, যারা আসে অভ্যাসগত অপরাধী শ্রেণি থেকে। সরল ভাষায় এরা টোকাই।

 

মাঝখানে ১০ বছরের মত সাজ্জাদের এই চক্র একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিল। চক্রটিকে নিষ্ক্রিয় করতে সে সময়ে ভূমিকা রাখা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে চক্রের কাজের ধরণ সম্পর্কে জানা গেছে।

 

তাদের মধ্যে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ধরুন নির্মাণসামগ্রীর দোকানগুলোতে তাদের লোক আছে। বাড়ি করতে গেলে আপনি এসব কিনবেন। ফলে ওই দোকানগুলো থেকে তথ্য যায় কে কোথায় বাড়ি করছে। সেখান থেকে তথ্য নিয়েই এরা কল করে। টোকাইদের দিয়ে আগুন দেয়, ভয় দেখায়, গুলিও করে। অথচ এই টোকাইদের বড় অংশই জানে না, তারা কেন কার জন্য কাজটি করছে। তাদের শুধু বলা হয়, এই কাজ করবি, বিনিময়ে পাঁচ হাজার টাকা পাবি। তারা সেটা করে।’

 

একসময় নিয়ন্ত্ররেণ থাকা সাজ্জাদের চাঁদাবাজি এখন কেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না- এই প্রশ্নের জবাবে সিএমপির সহকারী কমিশনার আমিনুর রসুল বলেন, ‘সেই সময় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়েছে আপনারা জানেন। আমরা এখন আর বিচার-বহির্ভূত কোনো প্রক্রিয়ায় যেতে চাচ্ছি না।’

 

দফায় দফায় প্রকাশ্য গুলির ঘটনায় জড়িতদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে না পারার বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা চোরের মত এসে গুলি করে চলে যায়। এখানে তো তাদের কোনো বাহাদুরি নেই। আমরা তাদের আতুরঘর নষ্ট করে দেব। সেজন্য অপারেশন ‘এস ড্রাইভ’ শুরু করা হয়েছে। আর তারা যদি পুলিশের মুখোমুখি হয়, তাহলে অস্ত্র বের করলেই গুলি করার জন্য কমিশনার নির্দেশনা দিয়েছেন। মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই- এগুলো নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’

 

নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খানের অপরাধ জগতে হাতেখড়ি হয় ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের মধ্য দিয়ে। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকাণ্ড সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে হয়েছিল বলে পুলিশ ও নিহতদের পরিবারের দাবি।

 

সেই বছর অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন। এরপর থেকেই বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন তার বাহিনী। অবশ্য ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও খালাস পান সাজ্জাদ।

 

 

অভিযান শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। ছবি: এশিয়া পোস্ট
অভিযান শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

সর্বশেষ ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ অপারেশন ‘সিমালটেনিয়াসলি ড্রাইভ’ বা ‘এস ড্রাইভ’ শুরু করেছে। রোববার (১ মার্চ) রাত থেকে শুরু হওয়া এই অপারেশনের প্রথম দিনে মহানগরের ১৫ থানায় ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি দেশিয় বন্দুক, শর্টগান ও পিস্তলের ২২টি গুলি এবং প্রায় ৫০০ ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার সহকারী কমিশনার আমিনুর রসুল এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

পুলিশের পাহারার মধ্যে ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনার পর ঘোষণা দিয়ে নগরজুড়ে ‘এস ড্রাইভ’ অভিযান শুরু করে সিএমপি। সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মেট্রোপলিটন এলাকায় সিএমপির সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের নিয়ে একযোগে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের ভাষায় এটিই ‘এস ড্রাইভ’। কোনো একটি আস্তানায় হানা দিলে যাতে অন্য অপরাধীরা সরে যেতে না পারে, সে জন্য একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। ওসি থেকে অতিরিক্ত কমিশনার পর্যন্ত সব কর্মকর্তা এতে অংশ নিচ্ছেন।

অভিযান শুরুর আগে রোববার রাতে সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, একটি ঘটনায় নগরবাসীর মনে কিছুটা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। সেই আশঙ্কা দূর করতেই এই অভিযান। অপরাধীদের ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের সম্ভাব্য আস্তানায় অভিযান চলছে। পুলিশের কাছে তথ্য আছে, তারা চট্টগ্রাম শহরের বাইরে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করছে। সেখানেও অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, নগরের প্রতিটি প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। অস্ত্র বাইরে থেকে আনা হয়নি, কারণ শহরের সব প্রবেশমুখে তল্লাশি চৌকি আছে। শহরের কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এমন একাধিক স্পট শনাক্ত করে একযোগে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।