একীভূত হওয়া পাঁচটি সংকটাপন্ন বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের ক্ষুদ্র শেয়ার বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। নতুন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। গত বছরের শেষ দিকে এসব ব্যাংক একীভূত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বর্তমানে শেয়ারবাজার থেকে ওই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার কেনা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে মোট কত অর্থ প্রয়োজন তা হিসাব করছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি প্রাথমিক তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেওয়া হবে শেষ কার্যদিবসে শেয়ারের বাজারমূল্যে নাকি অভিহিত (ফেস) মূল্যে সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নির্ধারণে নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা ও আইনি দিকগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ শিগগিরই বিষয়টি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে উপস্থাপন করবে। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণের অর্থ জোগাড়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এর আগে বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদের কাছে উত্থাপন করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই তিনি দায়িত্ব ছাড়েন। দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং ক্ষতিপূরণযোগ্য শেয়ারহোল্ডারের সংখ্যা ও প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাগজপত্র প্রায় সম্পন্ন। খুব শিগগিরই প্রস্তাবটি মন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। কর্মকর্তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শেয়ার মূল্যে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কেনা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবনতির দায় তাদের ওপর বর্তায় না। বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষিত হিসাবের ভিত্তিতেই শেয়ার কিনেছিলেন, যেখানে ব্যাংকগুলোকে লাভজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সরকার নিজেই যখন ব্যাংকগুলো অধিগ্রহণ করেছে, তখন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া নৈতিক ও নীতিগতভাবে যৌক্তিক। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে সরকার ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের-২০২৫ আওতায় আর্থিকভাবে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক তথা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। সরকার কোষাগার থেকে এই ব্যাংকের অনুকূলে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন বরাদ্দ দেয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত বিমা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড় করে। যার মাধ্যমে প্রত্যেক আমানতকারী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পান। তবে এখনো পর্যন্ত ক্ষুদ্র শেয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ কার্যকর হয়নি। কারণ তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর একীভূত ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেন এবং শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারে এসব শেয়ারের লেনদেন বন্ধ করে দেয়।