চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। আলোচ্য সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা যে পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশকে ছাড় করেছে তার চেয়ে বেশি অর্থ সুদ পরিশোধ বাবদ খরচ হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-জানুয়ারি সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থছাড় করেছে ২.৬৪১ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে একই সময়ে আগের নেয়া বিভিন্ন ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের পরিশোধ করেছে ২.৬৭৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, প্রাপ্তি বা অর্থছাড়ের তুলনায় পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বৈদেশিক ঋণ ছাড় কমেছে ৩২.৩৯ শতাংশ। গত বছরের এসময়ে ছাড় হয়েছিল ৩.৯৩৮ বিলিয়ন ডলার। তবে গত বছরের তুলনায় ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১০ শতাংশ। গত বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ পরিশোধ করেছিল ২.৪১৮ বিলিয়ন ডলার।
ইআরডির কর্মকর্তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর থাকায় বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কম হয়েছে। অন্যদিকে, অতীতে নেয়া অনেক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড [কিস্তি শুরুর আগের বিরতি সময়] শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন বড় অঙ্কের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। তবে ইআরডি মনে করছে, পুরো অর্থবছরের হিসাব করলে অর্থছাড়ের চেয়ে পরিশোধ বেশি হবে না। যেমন, গত অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছিল ৪.০৮৬ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে ছাড় হয়েছিল ৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছর শেষেও প্রাপ্তি পরিশোধের চেয়ে বেশি থাকবে বলে আশা করছে বিভাগটি। এছাড়া, ঋণ পরিশোধের একটি ইতিবাচক দিক হলো, এতে বৈদেশিক ঋণের পুঞ্জীভূত দায় কমে।
কমেছে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ: প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি সই কমেছে। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ২ দশমিক ২৭৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। ফলে এটি গত বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ কম।
গত অর্থবছরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, সরকার পতন এবং প্রশাসনে অস্থিরতার কারণে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার সংকটে প্রতিশ্রুতির গতি কমেছিল। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ায় এই প্রবাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিশ্রুতি বেশি এডিবির, অর্থ ছাড়ে এগিয়ে রাশিয়া: গত ৭ মাসে সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি। এসময় এক দশমিক ২৬৯ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি। এর পরেই রয়েছে বিশ্বব্যাংক ২৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসময় এআইআইবি, জাপান, ভারত, চীন, রাশিয়া নতুন করে ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবে গত ৭ মাসে রাশিয়া ৫৭৬ মিলিয়ন ডলার অর্থছাড় করেছে। এছাড়া এডিবি ৫৩৬, বিশ্বব্যাংক ৫৫৫, চীন ২২০, জাপান ১৮৩ মিলিয়ন ডলার ঋণ ছাড় করেছে।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, উন্নয়ন সহযোগীরা সাধারণত স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণে সক্ষম সরকারের সঙ্গে বড় ঋণের চুক্তি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন করে বৈদেশিক ঋণ ছাড় ও প্রতিশ্রুতি ধীর হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তিনি আরও জানান, অতীতে নেয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন পরিশোধের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ফলে নতুন করে যত ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ মূলধন ও সুদ হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক ঋণের নিট প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে যাচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত নতুন সরকার এখন দায়িত্ব নিয়েছে। ভবিষ্যৎ চাপ সামলাতে হলে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন ও জরুরি প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। তা না হলে বৈদেশিক সহায়তার ঘাটতি তীব্র হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়বে।