পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ হামলা চালিয়ে এই উন্মাদনার পারদ জ্বালিয়ে দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন সব বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব সহ প্রায় সব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তারা ইরানকে পাল্টা হুমকি দিয়েছে।
বলেছে, ইরান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। এসব দেশের জবাব দেয়ার অধিকার আছে। ফলে ওইসব দেশ যদি পাল্টা আঘাত হানে ইরানে, তাহলে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। এ জন্য ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছে সচেতন মহল। যখন পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল, তখনই এই হামলার পরিকল্পনা সাজানো হয়। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার দমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলেছেন- ‘শান্তির দূত তার আসল চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন এবার।’ যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে অনেক দেশ। উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বিভিন্ন দেশ ও মহল থেকে।
ইরানে হামলার আগেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। যেমনটি সতর্কতা দেয়া হয়েছিল, ঠিক সেরকমই মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে যুদ্ধপরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে আক্রান্ত হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে হামলা করবে। গতকাল ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পর ইরান সেই কাজটিই করেছে। তারা সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের দক্ষিণে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৬০ জন।
বাহরাইন নিশ্চিত করেছে যে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের হেডকোয়ার্টারে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে তাদের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবিতে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে। ইরানের এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে এসব দেশ। তারা বলেছে, ইরানের এসব হামলার জবাব দেয়ার অধিকার তাদের আছে। ইরান এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। ওদিকে হামলার পর ইরানি জনগণকে উসকে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তাদেরকে ক্ষমতা দখল করতে উৎসাহিত করেছেন। বলেছেন, আমরা যেখানে শেষ করবো, সেখান থেকে তোমাদেরকে সরকারের দখল নিতে হবে। একজন প্রেসিডেন্ট অন্যদেশের বিরুদ্ধে এভাবে উস্কানি দিতে পারেন কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে।
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাসিরজাদেহ ও গার্ড কমান্ডার পাকপুর নিহত: ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং রেভ্যুলুশনারি গার্ডসের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। তিনটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে এ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আহত হয়েছেন কিনা তা অনুসন্ধান করছে ইসরাইল। এ খবর প্রকাশের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার বলেছে, আমরা হয়তো কয়েকজন কমান্ডারকে হারিয়েছি। তবে সেটা অতো বড় কোনো সমস্যা নয়। এনবিসি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলাকে বিনা উস্কানিতে, অবৈধ হামলা বলে আখ্যায়িত করেন। বলেন, এই হামলা চরমভাবে অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষায় কারও সহায়তার প্রয়োজন নেই। আমরা আমাদেরকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলাকে তাদের আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন।
ইইউ নেতাদের সর্বোচ্চ সংযম আহ্বান: ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কস্তা বলেছেন, ইরান সম্পর্কিত সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, আমরা সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে। তারা আরও জানান, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থানরত ইইউ নাগরিকদের সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে। ইইউ’র পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কাল্লাস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের মধ্যেও ইইউ কূটনৈতিক পথ অনুসন্ধান করছে। তিনি বলেন, ইইউ ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করেছে। আমি ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার ও অঞ্চলের অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা আরব অংশীদারদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছি। তিনি আরও বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রক্ষা করা অগ্রাধিকার। ইইউ’র কনস্যুলার নেটওয়ার্ক নাগরিকদের অঞ্চল ছাড়তে সহায়তা করছে এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
রেড ক্রস প্রধানের সতর্কবার্তা: আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রেসিডেন্ট মিরজানা স্পোলজারিক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা বিপজ্জনক বিশৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, এই সামরিক উত্তেজনা পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের জন্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধের আইন মানা বাধ্যতামূলক, এটি কোনো বিকল্প নয়। আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাতে জেনেভা কনভেনশন প্রযোজ্য। হাসপাতাল, বাড়িঘর ও স্কুলের মতো বেসামরিক অবকাঠামোকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হবে। চিকিৎসাকর্মী ও জরুরি সেবাদাতাদের নিরাপদে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
একতরফা সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর: স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ উত্তেজনা বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত ও বৈরী করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, আমরা অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনের দাবি জানাই এবং আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণভাবে মেনে চলার আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে তিনি ইরানের সরকার ও রেভল্যুশনারি গার্ডের কর্মকাণ্ডও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান: ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে যে, ইরান থেকে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরাইলের দিকে আসতে শনাক্ত করা হয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে। বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘জনসাধারণকে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।’ এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। তারা আরও জানায়, এ মুহূর্তে ইসরাইলি বিমানবাহিনী হুমকি প্রতিহত করতে এবং প্রয়োজন হলে তা আঘাত করে নিষ্ক্রিয় করতে কাজ করছে। এ ছাড়া, সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অভেদ্য নয়। তাই জনগণের জন্য অত্যন্ত জরুরি যে, তারা হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা মেনে চলতে থাকবেন। সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে নির্দেশনা অনুসরণ করতে।’
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ: ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জবাবে তারা ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পাঠিয়েছে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বিরুদ্ধে শত্রু ও অপরাধী শক্তির আগ্রাসনের জবাবে, অধিকৃত ভূখণ্ডের দিকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রথম ঢেউ শুরু হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। ইরানি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সব সম্পদ এখন তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, তারা ইসরাইলকে বলছেন ‘যা আসছে তার জন্য প্রস্তুত হতে’ এবং তাদের জবাব হবে প্রকাশ্য ও কঠোর। ‘এখন আর কোনো লাল রেখা নেই।’ তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সব সম্পদ ও স্বার্থ এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই আগ্রাসনের পর আর কোনো লাল রেখা নেই। সবকিছুই সম্ভব, এমন পরিস্থিতিও যা আগে বিবেচনায় আনা হয়নি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এমন একটি আগ্রাসন ও যুদ্ধ শুরু করেছে যার বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি হবে। আমরা এই যৌথ মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে বিস্মিত হইনি এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া হবে জটিল, যার কোনো সময়সীমা নেই। তিনি আরও বলেন, ইরানকে সংযম দেখাতে বা আত্মসমর্পণ করতে বলা ‘অগ্রহণযোগ্য এবং নিছক কল্পনা মাত্র।’ ওদিকে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে ভূপাতিত করেছে।
বাহরাইনে বিস্ফোরণ: ওদিকে, বাহরাইনে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর আগে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের নিকটবর্তী নিরাপদ স্থানে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
কাতারের বাসিন্দাদের ঘরে থাকার পরামর্শ: কাতার মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে সকল বাসিন্দাকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বার্তায় বলা হয়েছে, বাসায় বা অন্য যেখানেই থাকুন না কেন, সামরিক ঘাঁটি থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করুন।
রুশ কর্মকর্তার মন্তব্য: ইরানে হামলা চালিয়ে ‘শান্তির দূত আবারো তার আসল চেহারা দেখিয়েছে’
ইরানে হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার ‘আসল চেহারা’ দেখিয়েছে। ইরানে হামলার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দমিত্রি মেদভেদেভ এ অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এর আড়ালে সামরিক অভিযানকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে তারা। মেদভেদেভ টেলিগ্রামে বলেন, ‘শান্তির দূত আবারো তার আসল চেহারা দেখিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে সব আলোচনা ছিল একটি আড়াল মাত্র। এতে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না। কেউই সত্যিকারের কোনো সমঝোতা করতে চায়নি।’
দেশে দেশে বিস্ফোরণ, অস্থিতিশীল হতে পারে মধ্যপ্রাচ্য: ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে বিস্ফোরণ হয়েছে। আগেই আভাস বা সতর্কতা দেয়া হয়েছিল যে, ইরানে এবার হামলা হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেই যুদ্ধ। কিন্তু পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানকে আলোচনায় রেখে আড়ালে এই যুদ্ধের ম্যাপ সাজিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন অভিযোগ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দমিত্রি মেদভেদেভ। ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে বিস্ফোরণ হয়েছে সে সম্পর্কে ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আল-সালেম বিমানঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তবে সৌদি আরবেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন আল-জাজিরা বলছে, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিকে টার্গেট করেছে ইরান। বাহরাইন নিশ্চিত করেছে যে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের হেডকোয়ার্টারে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে তাদের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবিতে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে। এর আগে ইরানের আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে যে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
আমিরাত, বাহরাইন ও কাতার যা বললো: ইরান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে টার্গেট করে ক্ষেপণাস্ত্র চালানো হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন প্রভৃতি। তবে তাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিকে টার্গেট করার বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাইরাইন। তারা জানিয়েছে, ইরানি হামলার জবাব দেয়ার ‘পূর্ণ অধিকার’ তারা সংরক্ষণ করে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের দেশে টার্গেট করেছে। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আবুধাবির একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ (শার্পনেল) পড়ে কিছু বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এ ঘটনায় এশীয় বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই হামলার আমরা সর্বোচ্চ ভাষায় নিন্দা জানাই। বেসামরিক স্থাপনা, অবকাঠামো ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং এটি কাপুরুষোচিত কাজ, যা বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে। আরও বলা হয়েছে, এই হামলা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই উত্তেজনার জবাব দেয়া এবং নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়ার পূর্ণ অধিকার রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দেশটি ‘যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সক্ষম।’
ইসরাইল জুড়ে সাইরেন বাজানো হয়েছে: ইরানে হামলা চালানোর পর পরই ইসরাইল জুড়ে সাইরেন বাজানো হয়েছে। বিবিসি’র মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা হুগো বাশেগা জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৮টা ১৫ মিনিটে ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে সাইরেন বাজতে শুরু করে। সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করতেই এই সাইরেন বাজানো হয়। ইসরাইল ইরানে এই হামলা এমন এক সময়ে করেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং যুদ্ধ এড়ানোর লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল। আগামী সপ্তাহে আলোচনার পরবর্তী ধাপ চালিয়ে যায়ার কথা ছিল। আলোচনায় ইরান কিছু ছাড় দিয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে ইরানের নেতাদের চুক্তিতে রাজি করাতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। শুক্রবার তিনি বলেছেন, আলোচনার অগ্রগতিতে তিনি ‘খুব সন্তুষ্ট নন’।
ইসরাইলের প্রাথমিক হামলায় মার্কিন সেনাবাহিনী জড়িত কি না এবং হামলার লক্ষ্যবস্তু কী, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এখন সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন কেন হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি খুব কম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরান ঘোষণা করেছে যে কোনো হামলার জবাব তারা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেবে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাট্জ বলেছেন, এই ‘প্রি-এম্পটিভ হামলা’ ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দূর করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছে। গত জুনে ইরানের ওপর হামলা চালায় ইসরাইল। যা ১২ দিনের যুদ্ধে রূপ নেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও সেই সংঘাতে যোগ দেয় এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়।
ইসরাইলে জরুরি অবস্থা, জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান: ইরানের ওপর হামলার পর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ইসরাইল। জনগণকে ঘরের বাইরে না বেরুনোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। পশ্চিম জেরুজালেম থেকে সাংবাদিক নূর ওদেহ জানাচ্ছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং নাগরিকদের আশ্রয়কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি, ইসরাইল তাদের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই অভিযান শুরু করেছে- যেখানে তারা বলে আসছে যে ইরান ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য খুবই সীমিত। তবে ইরানের ওপর এমন হামলা যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কার্যালয়ের কাছে হামলা, খামেনিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে
শনিবার সকালে ইরানের রাজধানী তেহরান একাধিক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। ইসরাইল ও মার্কিন কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রও যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অগ্রিম প্রতিরোধমূলক সামরিক হামলা চালিয়েছে। এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাগুলো সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়ের নিকটবর্তী এলাকাগুলোতে আঘাত হানে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি তখন তেহরানে ছিলেন না। তাকে একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তেহরানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, যে এলাকায় হামলা হয়েছে সেখানে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। একই এলাকায় প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দপ্তরও অবস্থিত। এনডিটিভিকে এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, রাজধানীতে কমপক্ষে তিন থেকে চারটি পৃথক হামলার শব্দ তিনি শুনেছেন। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাট্জ হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দূর করার জন্য ইসরাইল একটি অগ্রিম হামলা চালিয়েছে। এই হামলা হঠাৎ করে হয়নি। তেহরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বাড়ছিল। হামলার ঠিক একদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হবে কি না সে বিষয়ে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ‘খুশি নন’ এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগ, এমনকি সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
ইরানে ট্রাম্পের হামলা অবৈধ ও অসাংবিধানিক: মার্কিন সিনেটর: ইরানে ট্রাম্পের সামরিক হামলাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড জে. মার্কি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই হামলা মার্কিন কংগ্রেস অনুমোদন দেয়নি। ট্রাম্পের এই হামলা সমস্ত আমেরিকানের জন্য বিপদ বয়ে আনবে। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের অবৈধ কর্মকাণ্ড একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মারাত্মক হুমকি। মার্কি বলেন, ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে ইরানের পারমাণবিক হুমকি অতি আসন্ন উল্লেখ করে তা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছেন। এমনকি জুনে তার অবৈধ ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘বিধ্বস্ত’ করা হয়েছে বলে দাবি করার পরও ইরানের হুমকি আসন্ন-এটা বলেই যাচ্ছেন ট্রাম্প।
ইরানের জবাব হবে ‘চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়ার মতো’ শক্তিশালী, প্রস্তুতি চলছে: ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে পাল্টা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরান। তারা প্রতিশোধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানে এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে তেহরান পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, এই পাল্টা হামলা হবে ‘চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার মতো’- শক্তিশালী। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর ইরানের জবাব হবে কঠোর ও বিধ্বংসী- এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন- ‘আমরা তোমাদের সতর্ক করেছিলাম!’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা এখন এমন এক পথে হাঁটা শুরু করেছ, যার শেষ আর তোমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’ ওদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশের হাসপাতালগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। তাসনিম সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরুরি পরিস্থিতির জন্য এম্বুলেন্সও মোতায়েন করা হয়েছে।