জোট রাজনীতিতে বিকল্প ভাবছে না জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনেও জোটগতভাবে প্রার্থী দিতে চায় দলটি। এমন আভাস মিলছে দলটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায়।
প্রকাশ্যে এ বিষয়ে শীর্ষ নেতারা নীরব থাকলেও দলীয় সূত্র বলছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গড়ে ওঠা নির্বাচনী সমঝোতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে দলটি। স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে প্রস্তুতির কথা জানালেও ভেতরে জোট রাজনীতির সঙ্গেই অংশগ্রহণের বিষয়ে জোর আলোচনা হচ্ছে। জামায়াতের তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের স্থানীয় নির্বাচনের একটি শক্ত ভিত গড়তে চায় দলটি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এনসিপির প্রার্থীরা।
দলের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংসদের ভেতরে যেমন সমন্বয় প্রয়োজন, তেমনি রাজপথেও যৌথ রাজনৈতিক অবস্থান জরুরি। সেই বিবেচনায় জামায়াতের সঙ্গে সমন্বিত কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পক্ষেই ঝুঁকছে এনসিপি।
একাধিক নেতা মনে করছেন, এই সমন্বয় ভবিষ্যতে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক বলয় গঠনে সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে জুলাই সনদের আলোকে সাংবিধানিক সংস্কারের দাবিকে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও জোটভিত্তিক অবস্থান কার্যকর হবে বলে তাদের ধারণা।
উপজেলা নির্বাচন ঘিরে সীমিতসংখ্যক আসনে সমঝোতার বিষয়েও আলোচনা চলছে। সূত্রগুলো বলছে, আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হলেও প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি আসনের স্থানীয় নির্বাচনের জোটগত সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কথাবার্তা হচ্ছে। এর মধ্যে যে ৩০টি আসনে এনসিপি নির্বাচন করেছে জোটের শরিক হয়ে। সেখানে মোটামুটি একটি ভালো অবস্থান তৈরি হয়েছে। এসব আসনের বাইরেও আরও কিছু ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দু’দলের মধ্যে।
জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরেও একসঙ্গে প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত ও এনসিপি। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুই সিটিতেই প্রার্থী দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী এনসিপি। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, তৃণমূল সমন্বয় এবং যৌথ কৌশল নির্ধারণে এরই মধ্যে দলটির ভেতরে তৎপরতা শুরু হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্ধারণ ও নির্বাচনী মাঠ প্রস্তুত করার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক ও পরিকল্পনা সাজাচ্ছে এনসিপি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত আইনগুলো সংশোধন করেছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে। পরিবর্তন করা হয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশও। এসব অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ সংসদে অনুমোদন পেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারো নির্দলীয় পদ্ধতিতে হবে। তবে দলগুলো অতীতের মতোই সমর্থন দেবে। থাকবে না দলীয় প্রতীক।
এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংসদে জামায়াতের সঙ্গেই বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে তারা। সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়েও একসঙ্গে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। অর্থাৎ নির্বাচন শেষ হলেও জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক দীর্ঘ হবে। বিশেষত আগামীর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের পূর্ণ সমর্থন চায় দলটি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দলকে তৃণমূলে আরও চাঙ্গা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দেখছেন এনসিপির নেতারা। ঢাকার দুই সিটিতে এনসিপি প্রার্থী দিতে আগ্রহী হলেও জামায়াতেরও প্রস্তুতি রয়েছে। সমঝোতা হলে সেক্ষেত্রে একটি এনসিপিকে ছাড়তে পারে, এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কারা সম্ভাব্য প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের নাম আলোচনায় আছে। ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ কিংবা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদীবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পদত্যাগের পর ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচন করার কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে এনসিপিতে যোগ দেন। পরে তাকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও দলীয় মুখপাত্র করা হয়। অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। ঢাকা উত্তরের আলোচনায় আছেন আরিফুল ইসলাম আদীব, তিনি এনসিপি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সব সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা মেয়রদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব শীর্ষ পদে তখন বেশির ভাগই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। পরে সরকার শীর্ষ পদে প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় এখনো প্রশাসকরা দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সবুজ সংকেত দেয়া আছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মানবজমিনকে বলেন, এনসিপি নিজের মতো করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তারিখ ঘোষণা হলে বা নির্বাচন ঘনিয়ে এলে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হতেও পারে। এখন পর্যন্ত এনসিপি এবং জামায়াত তাদের মতো করে চিন্তাভাবনা করছে।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মাহাবুব আলম মানবজমিনকে বলেন, আমরা আমাদের প্রার্থীদের তালিকা করছি। যারা প্রার্থী হতে চান স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে তাদেরকে আহ্বান করা হচ্ছে। প্রার্থী নির্বাচন ও মাঠ পর্যায় থেকে প্রার্থী বাছাই এগুলোই মেইন ফোকাস আমাদের। এরপর চিন্তা করবো জোটগতভাবে নির্বাচন করবো নাকি এককভাবে করবো। সারা দেশেই আমরা প্রার্থী খোঁজা শুরু করেছি।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে চেয়ারম্যান ও দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদকে সদস্য সচিব করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে দলটি।