সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ চালকদের আন্দোলনের মুখে সফল হয়নি ; উল্টো বেড়েছে । সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের জন্যও সড়কে ব্যাটারির রিকশা নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হবে ।
ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশার বিষয়ে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন , যানজট নিয়ন্ত্রণে ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারির রিকশা , অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা জরুরি । নিয়মের তোয়াক্কা না করে এভাবে যান চলাচল গ্রহণযোগ্য নয় ।
তবে অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করা হবে , নাকি নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে , সে বিষয়ে সিটি করপোরেশন , ট্রাফিক বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে । সড়ক পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায় , আগে রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকার রাস্তা ও অলিগলিতে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলে বাড়ছে দুর্ঘটনা । গতকাল রাজধানীর রামপুরা এলাকায় ।
ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রধান প্রধান সড়কেও উঠে আসে । সর্বত্র চলাচলের সুবিধায় সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে । জাতীয় মহাসড়কের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা । ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সরাসরি লেনেও বিনা বাধায় চলছে এসব যান ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় এসব যান এখন নিয়ন্ত্রণহীন । বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সফল হয়নি । এগুলোর লাইসেন্স দেওয়ার ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কোন সংস্থার থাকবে, তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছিল জটিলতা ।
সড়ক পরিবহন আইনে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষমতা বিআরটিএর থাকলেও ব্যাটারির রিকশা ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আগ্রহ দেখায় স্থানীয় সরকার বিভাগ । গত বছর স্থানীয় সরকার বিভাগ ব্যাটারির রিকশা, অটোরিকশার জন্য নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করলেও তা এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি ।
পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন , দেশে যাত্রী চাহিদার তুলনায় গণপরিবহন কম থাকার সুযোগে ঢাকাসহ সারা দেশে দ্রুত বেড়েছে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা, অটোরিকশা । এসব যানের অধিকাংশের নকশা ও কারিগরি মান যথাযথ নয় । নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকায় এগুলো কার্যকরভাবে তদারকি কঠিন হয়ে পড়েছে । এর প্রভাব পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায় । বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে , ইজিবাইক , সিএনজিচালিত অটোরিকশা , ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা , অটো ভ্যান , লেগুনা , মিশুকসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৬ জন , যা দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ১৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ । স্থানীয়ভাবে তৈরি নছিমন , করিমন , ভটভটি , আলমসাধু , মাহিন্দ্রা ও টমটমের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ৪৮৯ জন , যা মোট মৃত্যুর ৬ আরও ৪৮৯ জন , যা মোট মৃত্যুর ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন , ব্যাটারিচালিত রিকশা , অটোরিকশা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে দেওয়ায় সড়কে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে । যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই এসব যান চলাচল করছে । দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে এসব যানের বড় ভূমিকা রয়েছে ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন রাজধানীর যানবাহন ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে । এসব যান নিয়মের তোয়াক্কা না করায় প্রধান সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে । এসব যানের অনেক চালকের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণাও নেই । এসব যান নিবন্ধিত না হওয়ায় এবং কোনো সুনির্দিষ্ট ডেটাবেইস না থাকায় আইন প্রয়োগেও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে । প্রয়োগেও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে । অভিযান চালালে সাময়িকভাবে কমলেও কিছুদিন পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে । দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যা কত, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই ।
বিআরটিএর একটি সূত্র জানায় , সারা দেশে এ ধরনের যানের সংখ্যা ৫০-৬০ লাখ হতে পারে । এর মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ১৫ লাখের বেশি । বিআরটিএ যে ২০ ধরনের যানের নিবন্ধন দেয় ; সেগুলোর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা , অটোরিকশা নেই । ফলে অবৈধভাবে এগুলো সড়কে চলছে ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে , রাজধানীর মোহাম্মদপুর , বছিলা , কেরানীগঞ্জ , যাত্রাবাড়ী , মুগদা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ওয়ার্কশপে দেশীয় কারিগরেরা এসব যান বানাচ্ছেন । গত দুই বছরে চাহিদা বাড়ায় উৎপাদনও বেড়েছে । রাজধানীতে কমে গেছে প্যাডেল রিকশা । ব্যাটারিচালিত রিকশা অটোরিকশাচালকেরা বলছেন , কম পরিশ্রমে বেশি আয় হওয়ায় অনেকে এ পেশায় আসছেন ।
রামপুরা এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মুজাহিদ শুভ বলেন, ‘ জানি এটা বৈধ না ; কিন্তু অন্য কাজ নাই । সংসার চালাতে এই রিকশা চালাই । ’ সমাধান জানতে চাইলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ( বুয়েট ) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড . মো . হাদিউজ্জামান বলেন , এসব যান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে সমস্যার সমাধান হবে না । আগে স্বীকার করতে হবে যে , এই যান বাস্তবতার অংশ হয়ে গেছে । সুনির্দিষ্ট নীতিমালা , রুট নির্ধারণ , নিবন্ধন , ফিটনেস পরীক্ষা ও চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে । একই সঙ্গে গণপরিবহন উন্নত না করলে বিকল্পহীন মানুষ আবার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার দিকেই যাবে ।