বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একযোগে উদ্যোগ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য দায়িত্ব নেওয়া গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনে সক্রিয় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
গভর্নরের আগে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী : নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগেই রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে বন্ধ পাটকল, চিনিকল ও অন্যান্য শিল্পকারখানা চালুর মাধ্যমে পুরোনো শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিও।
গভর্নরের প্রথম বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা : গতকাল সকালে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে এখন লক্ষ্য হবে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি। বন্ধ কারখানা চালু করতে নীতিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সুবিধা এবং ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদার করা হবে।’ বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, গভর্নর গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযমী থাকবেন; তবে নিয়মিত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে মুখপাত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃ তফসিলে সার্কুলার : বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত রবিবার ঋণ পুনঃ তফসিল নীতিতে শিথিলতা আনে। এখন থেকে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই ঋণ পুনঃ তফসিল করা যাবে। এই অর্থের অর্ধেক আবেদনের সময় এবং বাকি অর্ধেক ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পুনঃ তফসিল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত তিন মাস সময় বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, যাঁরা এককালীন অর্থ জমা দিতে না পেরে ঋণ নবায়ন করতে পারছিলেন না, তাঁরা এখন নিয়মিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রয়োজনে সুদ মওকুফের সিদ্ধান্তও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় নিতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না অনেক তফসিলি ব্যাংক : তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। একাধিক উদ্যোক্তার অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান সত্ত্বেও অনেক তফসিলি ব্যাংক ঋণ পুনঃ তফসিলের আবেদন ঝুলয়ে রাখছে। বিশেষ করে আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংক একীভূতকরণ ও বিশেষ নিরীক্ষার অজুহাতে পুনঃ তফসিল অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। এমনই এক ঘটনায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এক গ্রাহককে জানায়, আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া চলায় এ মুহূর্তে তাঁর পুনঃ তফসিল প্রস্তাব অগ্রসর করা সম্ভব নয়।
পুনঃ তফসিল না করায় কারখানা চালু করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা : ঋণ পুনঃ তফসিল না হওয়ায় বহু উদ্যোক্তা বন্ধ কারখানা চালু করতে পারছেন না। শিল্পমালিকদের ভাষ্য, ব্যাংকিং সহযোগিতা ছাড়া যন্ত্রপাতি মেরামত, কাঁচামাল আমদানি ও শ্রমিক পুনর্নিয়োগ সম্ভব নয়।
বন্ধ শিল্পকারখানার বাস্তব চিত্র : ২০২৪ সাল শেষে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৯৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন ৩৮২, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোশেনের অধীন পাঁচ, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীন ছয় এবং বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের অধীন চারটি কারখানা রয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ। এতে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হন। এর মধ্যে সাভারে ২১৪ ও গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে বেক্সিমকো গ্রুপের ১৩টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বেকারত্ব বাড়ছে, প্রত্যাশা নতুন সরকারের দিকে : এ প্রেক্ষাপটে দেশে বেকারত্ব ২৭ লাখ ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব বলছে। যুব বেকারত্ব ২৮ শতাংশের বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা গেলে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। সব মিলিয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হলে বন্ধ কারখানা চালু, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এমন প্রত্যাশাই এখন দেশের শিল্প খাত ও সাধারণ মানুষের।