নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনের সর্বস্তরে ব্যাপক পরিবর্তন হলেও মো. আলী হোসেন ফকিরকে আইজিপি হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে রদবদল শুরু হয়েছে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, মব ও সন্ত্রাস বন্ধ এবং পুরো পুলিশ বাহিনীর মধ্যে ভেঙে পড়া মনোবল ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে হলে দ্রুত এসবি, র্যাব, রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্টোপলিটন কমিশনার, জেলার এসপি ও থানার ওসিদের মধ্যে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ প্রশাসনকে আওয়ামী লীগ ১৫ বছর দলীয়করণ করেছে। এর পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জামায়াতীকরণ করা হয়েছে। সেখান থেকে বের করে আনতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে পুলিশ প্রশাসনকে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে পুলিশের বেশ কয়েকটি ইউনিট প্রধান অতিরিক্ত আইজি ও ডিবি প্রধান একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের পক্ষে নানা কৌশলে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। একই সাথে এসব পুলিশ কর্মকর্তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছাত্রসহ বেশ কয়েকজন উপদেষ্টাকে খুশি করতেও অতিমাত্রায় ব্যস্ত ছিলেন, যা ওপেন সিক্রেট। তাই সার্বিক বিষয় মাথায় রেখে বর্তমান জনগণের সরকার দেশে ও সাধারণ মানুষের জন্য নিবেদিত পেশাদার, সৎ ও যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডিং পদে দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করে কাক্সিক্ষত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে তৈরি করা সম্ভব হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যদিও রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। প্রশাসনে গতিশীলতা আনতে পরিবর্তন অবশ্যই আসবে। জননিরাপত্তা বিঘœকারী যেকোনো সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করবে এবং এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তাই দেশের মানুষের আশা, সরকারকে অতি দ্রুত পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সৎ, পেশাদার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেবে।
পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মঙ্গলবার ইনকিলাবকে বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশ বাহিনীকে একটি লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমন করা, দখল, চাঁদাবাজি এমনকি মিথ্যা মামলা বা মামলা না দিয়ে ধরে নিয়ে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন যেন একটি অলিখিত আইনে পরিণত করেছিলেন অধিকাংশ পুলিশ কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অত্যাচার-নির্যাচনের মাত্রা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন দেশের ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে রাজপথে নেমে আসে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ যেভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ছাত্র-জনতার উপর গুলি চালানোর হুকুমদাতা ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের অনেকেই এর মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অনেকেই একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তবে অনেকেই এখনো পুলিশ বাহিনীতে ঘাপটি মেরে রয়েছেন। পুলিশ সদর দফতরসহ পুলিশ বাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্ট এসব পুলিশ কর্মকর্তাকে দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি পুলিশ বাহিনী সংস্কার করা না হলে এ বাহিনীকে জনতার পুলিশ হিসেবে তৈরি করা কঠিন হবে বলে এ কর্মকর্তারা মন্তব্য করেন।
ওই কর্মকর্তারা আরো বলেন, এক সময় যে সব পুলিশ কর্মকর্তা চরম অবহেলিত ছিলেন, তারাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পেশাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পুলিশের মধ্যে চেইন অব কমান্ড তৈরির চেষ্টা করেছেন। অথচ তাদের বছরের পর বছর প্রমোশন ও পোস্টিং দেয়া হয়নি। নতুন সরকার পুলিশকে জনগণের আস্থার জায়গায় যদি ফেরাতে চায়, তাহলে সংস্কার করে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। যারা যোগ্য তারা যেন ভালো থাকে, সে ব্যবস্থা করলেই ভালো।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ও নির্বাচনের আগে এসবি, সিআইডি ও ডিবিসহ পুলিশের বেশ কয়েকটি ইউনিটের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং একটি রেঞ্জের ডিআইজি অপেশাদার এবং বিএনপি-বিরোধী কার্যকলাপের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। একই সাথে নির্বাচনের সময় বেশ কয়েকটি জেলার এসপিও অপেশাদার এবং একটি ইসলামী দলের পক্ষে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের হুমকিসহ নানা ইঞ্জিনিয়ারিং করার চেষ্টা করেছেন। এ সব বিষয় আমলে নিয়ে পুলিশকে জনতার বাহিনী হিসেবে তৈরি করতে যোগ্য, সরকারের প্রতি অনুগত ও সৎ কর্মকর্তাদের পদায়ন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের শীর্ষপদসহ বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান পদে পরিবর্তন হচ্ছে। অনেকে পদ পেতে দৌড়ঝাঁপও শুরু করেছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার পদ নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। জেলার পুলিশ সুপাররা (এসপি) নজর রাখছেন শীর্ষ পদের রদবদল নিয়ে। শীর্ষ পদের রদবদলের পরপরই রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপি পদে রদবদল শুরু হবে।
নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে দ্রুত জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও নৈতিকতা উন্নতকরণের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে চাই। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর যুগোপযোগী উন্নয়নে আমাদের একটি সঠিক পরিকল্পনা দরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন মেট্রোপলিটনের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, এসপিসহ বড় বড় পদে পরিবর্তন আসছে। এতে প্রাধান্য পাবে মেধা, সততা, পেশাদার, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতাকে প্রাধান্য দেয়া হবে। নির্বাচনের পর কিছু ইউনিটে অভ্যন্তরীণ বদলি হলেও তা হবে নিয়মমাফিক ও পর্যায়ক্রমিক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক পুলিশের নামে মামলা হয়েছে, কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। এরপর আবার গণহারে বদলির ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। গত ১৭ মাসে পুলিশ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। নতুন সরকারকে পুলিশ বাহিনী ঢেলে সাজিয়ে দ্রুত পুলিশের চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে হবে। পুলিশকে জনবান্ধব, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক করা, তাদের ভালো কাজের মূল্যায়ন করা, অহেতুক কাউকে হয়রানি না করাসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে হবে নতুন সরকারকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও প্রায় একই মন্তব্য করেছেন। মঙ্গলবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের পদায়ন ছাড়াও অন্য পদে বদলির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। রদবদল বিষয়ে সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। নতুন সরকার যদি পুলিশকে জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে চায়, তবে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার জরুরি। এতে আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ স্বাভাবিকভাবে উন্নত হবে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব সরকার ও সাধারণ মানুষ উভয়ের কাছেই অনুভূত হবে।
নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকির : আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরকে পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখা উপসচিব তৌছিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। তিনি বর্তমান আইজি বাহারুল আলমের স্থলাভিষিক্ত হলেন। আলী হোসেন ফকির বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের সদস্য। রাজনৈতিক কারণে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তাকে একবার চাকরিচ্যুত করা হয়। বিএনপি আমলে তিনি চাকরি ফিরে পান। এরপর আবার আওয়ামী লীগ আমলে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আইনি প্রক্রিয়ায় এসপি পদমর্যাদায় চাকরি ফিরে পান আলী হোসেন ফকির। এরপর সুপার নিউমারারি ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পান। আলী হোসেন ফকিরের বাড়ি বাগেরহাটে। ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার প্রথম আমলে আলী হোসেন ফকির আওয়ামী রোষানলের শিকার হন। সে বছর তাকে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় চাকরি ফিরে পান। কর্মজীবনে তিনি চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান। এসপি হিসেবে একাধিক জেলায় পদায়ন পান। সর্বশেষ ২০০৮ সালে ডিএমপির উত্তরা জোনের ডিসি ছিলেন। এরপর তিনি জাতিসংঘ মিশনে যান। জাতিসংঘ থেকে দেশে ফেরার পর রাজশাহী ডিআইজি অফিসে এসপি হিসেবে সংযুক্ত করা হয় তাকে। সেখানে থাকা অবস্থায় ২০২২ সালে শেখ হাসিনার সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়।
বাহারুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল
সদ্য বিদায়ী পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব গোলাম রব্বানী সাক্ষরিত আদেশে উল্লেখ করা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর তারিখের প্রজ্ঞাপনমূলে পুলিশ মহাপরিদর্শক পদে নিয়োগকৃত বাহারুল আলমের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ তার আবেদণের প্রেক্ষিতে বাতিল করা হলো।