রমজান মাস ও ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী-ক্রেতাদের পণ্য কেনাবেচার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এই সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে অপরাধচক্র। পেশাদার ও মৌসুমি অপরাধীরা ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি-লুট, চাঁদাবাজি, টিকিট কালোবাজারি, জালনোট কারবার এবং মার্কেটগুলোতে পকেটমার ও মলম পার্টি-অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। অসাধু ব্যবসায়ীরা খাবারের ভেজাল বৃদ্ধি করে। মার্কেট, টার্মিনাল ও ইফতারের সময় ভিড় কাজে লাগিয়ে মোবাইল-টাকা চুরি করে। রাস্তাঘাট, যানবাহনসহ বিভিন্ন স্থানে নানাবিধ ছদ্মবেশি প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েন সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় হয়ে ওঠে এসব অপরাধীরা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো ঘটছে নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। অপরাধচক্রের সদস্যরা অনেকে ধরা পড়ছে পুলিশের জালে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় রোজা, ঈদ অথবা বড় কোনো ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান এলে বেড়ে যায় এসব অপরাধীদের দৌরাত্ম্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোজা ও ঈদকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগ পাওয়া যায়। তার মধ্যে অন্যতম ছিনতাই, মলম পার্টি, জালটাকা, অজ্ঞান পার্টিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতারক এই সময়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী পরিবহনের নিরাপত্তায় বিশেষ ‘এস্কর্ট’ সেবা ও বাজারে মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে র্যাব, পুলিশ। আগে থেকেই নিরাপত্তায় মার্কেট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কড়া নজরদারি ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
সংশ্লিষ্টসূত্র মতে, অপরাধীরা একেক সময় একেক এলাকায় অবস্থান করে অপরাধের ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের টার্গেট করে অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যরা বিভক্ত হয়ে কাজ করে। যাত্রীবেশে গাড়িতে উঠে টার্গেট ব্যক্তিকে অজ্ঞান করে সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলস্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বাড়ে অপরাধীদের তৎপরতা।
শনিবার ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের টিকিট কালোবাজারি বিরোধী অভিযানে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় চিহ্নিত টিকিট কালোবাজারি উত্তম চন্দ্র দাস (৩০)কে বিভিন্ন রুটের ১৬টি টিকিটসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে রেলওয়ে পুলিশ। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, উত্তম চন্দ্র দাস দীর্ঘদিন যাবৎ অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহপূর্বক তা আগ্রহী যাত্রীদের নিকট অধিক মূল্যে বিক্রয় করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে টিকিট কালোবাজারির একাধিক মামলা রয়েছে।
রাজধানীর পল্টন এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসের ভেতর ব্যবসায়ীকে অজ্ঞান করে সব কেড়ে নিয়েছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। এ সময় তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। বুধবার রাতে পল্টনের বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটের সামনে ভিক্টর পরিবহনে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর নাম মো. মনিরুজ্জামান। তার বাড়ি শরীয়তপুরে। তিনি জিন্সের প্যান্টের ব্যবসা করেন। আশরাফ নামে এক পথচারী বলেন, সে বাসের মধ্যে অচেতন অবস্থায় পড়েছিল। আমাদের ধারণা অজ্ঞান পার্টির প্রতারক চক্ররা তাকে নেশা জাতীয় কোনো কিছু খাইয়ে অচেতন করে সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যায়।
সম্প্রতি ‘সিটি ঘি’ নামে একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৫ মণ নকল ঘি জব্দ করেছে মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশ। রমজান ও ঈদকে ঘিরে গ্রেপ্তারকৃত মাইনুল ইসলাম নকল ঘিয়ের উৎপাদন বাড়িয়েছিলেন। পুলিশ জানায়, শনিবার দুপুরে রংপুর দামোদরপুর গ্রামের প্রেসিডেন্ট মোড় এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। গত ৬ মাস আগে দামোদরপুর প্রেসিডেন্টের মোড় এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে নকল ঘিয়ের কারখানা করে মাইনুল। সেই কারখানায় কোনো ধরনের দুগ্ধজাত দ্রব্য ছাড়াই শুধু ডালডা, পামওয়েল ও কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার করে ‘সিটি ঘি’ নামে নকল ঘি তৈরি করতেন তিনি। তার উৎপাদিত নকল ঘি রংপুরসহ সারা দেশে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সরবরাহ করা হতো।
যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেট চেকপোস্টে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে মো. শাহ আলম (২৮) নামে এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় কর্মরত আছেন। গত শনিবার বিকালে দিকে এই ঘটনা ঘটে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। পুলিশ সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব পালন করার সময় অজ্ঞাত দু’জন ব্যক্তির কাছে দুটি ব্যাগ ছিল। সেটি তল্লাশি করতে চাইলে কোনো কিছু বোঝার আগেই তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে পালিয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে ডিএমপি’র সব এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির তৎপরতা ঠেকাতে ইতিমধ্যে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। এদিকে রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ক্রয়-বিক্রয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ ও বিভিন্ন দ্রব্যের লেনদেন বেড়ে যায়। এই সময়ে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ‘এস্কর্ট’ সেবা দিচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপি জানায়, কোনো ব্যক্তি, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের নগদ অর্থ ও মূল্যবান দ্রব্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পুলিশের সহায়তা প্রয়োজন মনে করলে ডিএমপি’র এস্কর্ট সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে সেবাপ্রত্যাশী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যে কোনো ধরনের ভেজাল মেশানো যাবে না। সবাইকে এ ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
পুলিশ জানায়, রাজধানীতে বড় বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র, শপিংমলে রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। রয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, পবিত্র মাহে রমজানে বিশেষ করে তারাবির সময় চুরি, ছিনতাই যাতে কোনোভাবেই সংঘটিত হতে না পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ডিএমপি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।