Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের ‘অন্তবর্তীকালীন’ শাসনের অবসান হলো। ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৮ মাস হলেও মবের শিকার নাগরিকের জীবনে নিশ্চয়ই এত কম সময় বলে মনে হয়নি। সংস্কারের গোলকধাঁধায় ফেলে ভোটাধিকার বলে কোনো কিছুর যে অস্তিত্ব আছে, তা যেন ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সীমাহীন ক্রান্তিকালে গঠিত হওয়া এই সরকারের কাছে জনমানুষের পাহাড়সম প্রত্যাশা ছিল।

 
বিদায়ি সরকার নানা ক্ষেত্রে সফলতার দাবি করলেও জনমানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, প্রেস সচিব কিংবা প্রধান উপদেষ্টা বিভিন্ন সময়ে যেসব ক্ষেত্রে সফলতার দাবি করেছেন সেসব আসলে কতটুকু সত্য? ফলে নানাবিধ তথ্য ও উপাত্তের আলোকে গত ১৮ মাসের ওপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে আসাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

 

মাত্র তিন সপ্তাহের আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূস সামনে চলে আসেন। প্রথমে ওটা আকস্মিক মনে হলেও পরে তিনি নিজেই জানিয়েছেন যে, হাসিনার পতন মেটিকিউলাস ছিল।

 
দেড় বছর পেছনে তাকালে আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে, সে সময় সরকার প্রধান হওয়ার জন্য নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিকল্প আর কেউ ছিলেন না। গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পেলেও, তার জনপ্রিয়তা ততখানি ছিল না, যতটা জনপ্রিয়তা তার বিরুদ্ধে ট্যাক্স ফাঁকির মামলা চলাকালীন সময় তিনি পেয়েছেন। মামলার ভারে জর্জরিত ইউনূসের অবস্থা দেখে দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করতে শুরু করেছিল, একজন সম্মানিত মানুষকে নিয়ে শেখ হাসিনা অযথা টানাটানি করছেন। কিন্তু এই প্রশ্নটি উত্থাপন করা নিশ্চয়ই অনুচিত হবে না যে, এখনো কি মানুষ একই রকম ভাবছে?

 

১. আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মবোক্রেসি

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি পরিস্থিতিতে তিনি সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন।

 
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বিদায়ের আগ পর্যন্ত সেই আইনশৃঙ্খলার একটুও উন্নতি হয়নি, বরং দিনে দিনে অবনতিই হয়েছে। দেড় বছরে কয়েক হাজার মবের ঘটনা ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, অন্তত ৩০০ মানুষ শুধু মব সহিংসতায় মারা গেছে। ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে মবে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালে ঢাকা শহরে ৬৪৩টি বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার হয়েছে এবং রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে দাফন ও সৎকার করা হয়েছে।
 
নদীগুলো অপরাধীদের ‘ডাম্পিং স্টেশন’ হয়ে উঠেছে, ২০২৫ সালে প্রতিদিন শুধু নদী থেকে ৪৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কতজনের মৃতদেহ তলিয়ে গেছে বা ভেসে গেছে সেটা অজানা। দিনে দুপুরে ডাকাতি, চুরি, মারপিট–এসব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তবে নির্বাচনের দিনটি ছিল একেবারে উল্টো। তাই প্রায় সহিংসতা ছাড়া একটা নির্বাচন করতে পারার জন্য সরকার ধন্যবাদ পাবে।

 

২. ইউনূস সরকারের সিভিতে লেখা থাকবে দীপু দাসের জ্বলন্ত শরীর

তবে ময়মনসিংহের ভালুকায় যে কায়দায় দীপু দাস নামের এক তরুণকে ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে প্রথমে হত্যা ও পরে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা সব ধরনের মবকে ছাড়িয়ে গেছে। শরীয়তপুরের ওষুধ ব্যবসায়ী খোকনকেও একই স্টাইলে প্রথমে ছুরিকাঘাতে হত্যা এবং পরে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি পরিবারকে একইভাবে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার রিপোর্ট বলছে, এই দেড় বছরে ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর অন্তত হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে দীপুকে হত্যার ধরন ও বীভৎসতা ড. ইউনূস সরকারের সিভিতে বিশেষভাবে লেখা থাকবে বলে মনে করি।

৩. রোহিঙ্গারা দেশে ফেরেনি, বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ হয়ে গেছে

ক্ষমতা নেওয়ার শুরুতেই ড. ইউনূসকে ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও, বাস্তবে তার করা কোনো গোল আমরা উদ্‌যাপন করতে পারিনি। পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য নেই। বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা এ বছরের রোজার ঈদ করবেন মিয়ানমারে, কার্যত সেটা যে হচ্ছে না তা না বললেও চলে। উল্টো এর মধ্যে অন্তত লাখ দুয়েক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। ৭০ হাজার সৌদি প্রবাসী রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পাসপোর্ট পাচ্ছে। আরাকান আর্মির গুলিতে আমাদের এক মেয়ের মাথার খুলি উড়ে গেছে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারেননি, বরং কথার বাণে সম্পর্কটাকে বিষিয়ে তুলেছেন। এই দেড় বছরে একটা দেশেরও ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে ঢাকায় সরিয়ে আনতে পারেননি, ফলে বিদেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ বাংলাদেশকে ভিসা ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বা ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে। আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে দেশ। পাসপোর্টের মান কমে ইয়েমেন, আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিন লেভেলে নেমে গেছে। দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসে ১১ বার বিদেশ সফর করলেও ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কার্যত ফেইল করেছে।

৪. উন্নয়নহীন দেড় বছর, নিজ জেলার প্রতি স্বজনপ্রীতি

স্বাভাবিকভাবেই এই স্বল্প সময়ে সরকার উন্নয়ন প্রকল্প খুব বেশি নেয়নি। ১৮ মাসে দুই লাখ কোটি টাকার ১৩৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ প্রকল্প নিয়েছেন চট্টগ্রামে, তার নিজের জেলায়। অথচ ২১টা জেলার জন্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই নেননি। শুধু ড. ইউনূস নন, অন্যান্য উপদেষ্টাদের বিশেষ করে ছাত্র উপদেষ্টাদের জেলাতেও বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করেছেন।

৫. কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের দেড় বছর

স্বজনপ্রীতির দিক থেকে মুহাম্মদ ইউনূস আগের সরকার প্রধানদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গে নিজের সাড়ে ৬ শ কোটি টাকার ট্যাক্স মওকুফ থেকে শুরু করে গ্রামীণের নামে ইউনিভার্সিটি, নিজের ভাইয়ের ছেলেকে উপপ্রেস সচিব, ইউনূস সেন্টারের পরিচালক লামিয়া মোর্শেদকে এসডিজি কাম সব কিছুর সমন্বয়ক, ইউনূস সেন্টারের ট্রাস্টি আশিক চৌধুরীকে বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান, গ্রামীণ ব্যাংকের এমডিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী বানিয়েছেন। এই স্বজনপ্রীতির তালিকা দীর্ঘ। আমি অন্তত ৩২টি পর্যন্ত তালিকাবদ্ধ করতে পেরেছি।

৬. বিদ্যুৎ সংকট মেটেনি, সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট

যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ২০২৬ সালে উদ্বোধন হওয়ার কথা, সেটি এখন অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালামাল এয়ারপোর্টে লাগা আগুনে পুড়ে গেছে, নতুন করে বাজেট বাড়ানো হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। গত দেড় বছরে দেশে নতুন এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন হয়নি, গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে প্রতিমাসে বাজার থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ারর চক্র সৃষ্টি করা হয়েছে। যে সিলিন্ডার এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা বিক্রি হতো সেই সিলিন্ডার আড়াই থেকে তিন হাজারে বিক্রি হয়েছে।

৭. নারীদের জন্য বিভীষিকার দেড় বছর

গ্রামীণ ব্যাংকের সফলতা থেকে নোবেল পুরস্কার, মুহাম্মদ ইউনূসের উত্থানের পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে নারী। কিন্তু তার শাসনকালে নারীরা সবচেয়ে বিপদ্‌গ্রস্ত সময় পার করেছেন। নারী সংস্কার কমিশনের একটা সুপারিশও গ্রাহ্য করা হয়নি, ওই কমিশন বাতিলের জন্য ঢাকায় বিরাট সমাবেশ করে সেখান থেকে নারীদেরকে বেশ্যা বলে গালি দেওয়া হয়েছে। জনপরিসরে নারীদের বিপদ আগের তুলনায় বেড়েছে, পোশাক নিয়ে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে, এসব করেছে সমাজের উগ্রপন্থিরা; এই শ্রেণীর ব্যাপক উত্থান হয়েছে; কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিল মাত্র চার শতাংশ। পাশের হার আড়াই ভাগেরও কম। আগের সংসদেও সাড়ে ১৯ শতাংশ নারী প্রতিনিধি ছিল, এবারের সংসদে নিকট অতীতের সবচেয়ে কমসংখ্যক নারী প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে।

৮. অন্তর্ভুক্তির নামে বিভক্তি, জেলে পচছে নিরপরাধ মানুষ

ক্রমশ বিভক্ত হতে থাকা দেশটাকে একত্র করে ইউনূসের সামনে জাতীয় হিরো বনে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। বহু বছর পরে আসা এই সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে পরিষ্কারভাবে দেশটাকে তিনভাগে ভাগ করে ফেলেছেন তিনি। দুই ভাগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে, আর আরেকভাগ–আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ থেকে দেশের মানুষকে বঞ্চিত করেছেন। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কর্মীদেরকে দমনপীড়ন করেছেন, জেলে মারা গেছেন অনেক আওয়ামী লীগ নেতা, যাদের মধ্যে সাবেক এমপি-মন্ত্রী আছেন কমপক্ষে তিন জন। ‘ডেভিল হান্ট’ নামে দুই দফা অপারেশন চালিয়ে তৃণমূলের অন্তত ৫ লাখ মানুষকে জেলে ভরে রেখেছেন। জামিন পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। জাতিসংঘ এসবকে মানবতাবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে।

৯. রিজার্ভে সফলতা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার কৃতিত্ব পাবেন

২০২৫ সালে রেমিট্যান্স এসেছে সোয়া তিন হাজার কোটি ডলার, যা ২৪ সালের চেয়ে ২২ ভাগ বেশি। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা এ সময়ে প্রচুর পরিমাণে টাকা পাঠিয়েছেন, এর পেছনে বড় কারণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। এই কৃতিত্ব তিনি পাবেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক পর্যায়ে রিজার্ভের পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও, শেষের দিকে এসে তার ব্যাপক পতন হয়। এক পর্যায়ে রিজার্ভ নেমে আসে ১৮ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের হিসেবে গত দেড় বছরে সেটি প্রায় সাড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারে উত্তীর্ণ হয়েছে, তবে সরকার বলছে, রিজার্ভ এখন ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংকগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। এ সময়ে নতুন করে অনাদায়ি ঋণের পরিমাণ কমেছে, টাকা পাচারও কমেছে। ৬টি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করার কাজ প্রায় সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এ কাজের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ধন্যবাদ পাবেন।

১০. জাতীয় ঋণ এখন ২৪ লাখ কোটি টাকা

তবে সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ কোটি টাকায়। এর মধ্যে অর্ধেক নিজ দেশ থেকে, বাকি অর্ধেক বিদেশি ঋণ। শুধু এক বছরের ব্যবধানেই আড়াই লাখ কোটি টাকা ঋণ করেছে সরকার। ফলে ঋণের সুদও বেড়েছে। দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন না করলেও সরকার এত টাকা ঋণ কেন নিয়েছে, সেটি খুঁজে দেখার দরকার। সরকার গ্রহণের পর বিএনপি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অঙ্কের বিল বকেয়া রেখে গেছে সরকার।

১১. বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে

২০২৩ সালে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ২১১ কোটি ডলার, ২৫ সালে সেটি ১৪০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, গত বছরের অবস্থা ছিল আরও খারাপ, মাত্র ৭৭ কোটি ডলার। এমনকি করোনার বছরেও এরচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে ঢুকেছে। বিনিয়োগের এই গতির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর সম্পর্ক আছে। কিন্তু আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে বিনিয়োগ বোর্ড সেটা স্বীকার করেননি। উল্টো, বিমান থেকে ঝাঁপ দেওয়া, নতুন নতুন প্রেজেন্টেশন দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। সমালোচনা খণ্ডাতে যত সময় তিনি ব্যয় করেছেন, বিনিয়োগ নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ততটা ব্যয় করলে দেশ উপকৃত হতো। বিনিয়োগ বাড়েনি বলে বেকারত্বও কমেনি। বিজিএমইএ বলছে গত দেড় বছরে ১৪ লাখ মানুষ চাকুরি হারিয়েছে।

১২. বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস পাওয়া হলো না

জুলাইয়ে রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস চেয়েছিল দেশের মানুষ। কিন্তু গত দেড় বছরে একটা বিশ্ববিদ্যালয়েও নিরপেক্ষ ভিসি নিয়োগ হয়নি। পরিবর্তন শুধু এটুকু হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের ভিসিদের সরিয়ে জামায়াত ও বিএনপিপন্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা তাহলে এই দাঁড়ায় যে, লীগের ভিসি খারাপ আর বাকি দলের ভিসি ভালো! শিক্ষায় কোনো গতি আসেনি। ছেলেমেয়েদের ক্লাসরুমে ফেরানো যায়নি। সারা দেশে ছাত্রদের হাতে শিক্ষকরা নিগৃহীত হয়েছেন। বছরের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীরা নতুন বই পায়নি। বইয়ের মান ও নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো ও দুর্নীতির কথা আর না বলি!

১৩. সংবাদমাধ্যমের ওপর নজিরবিহীন হামলা

সংবাদমাধ্যম স্বাধীন বলা হলেও তথ্য-উপাত্ত সেটি বলছে না। প্রায় সব মিডিয়ায় নিজেদের পছন্দের মানুষ বসানো হয়েছে। ৩০ জন সাংবাদিক এখনও জেলে। ৫২টা মিডিয়ায় নিজেদের পছন্দমতো লোক বসিয়েছে সরকার। হামলা চালিয়ে সেসব মিডিয়া দখলের ঘটনাও ঘটেছে। ‘ডেইলি স্টার’ ও ‘প্রথম আলো’ পুড়িয়ে দেওয়ার দায় এবং সেসময় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা মুহাম্মদ ইউনূসকে আজীবন পিছু তাড়া করবে।

১৪. সোশ্যাল মিডিয়ায় মত প্রকাশে স্বাধীনতা ছিল

তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা আগের তুলনায় ভালো ছিল। মানুষ কথা বলতে পেরেছে। তবে এর মধ্যেও শুধু ‘জয় বাংলা’ বলার অপরাধে মানুষ চাকরি হারিয়েছে, আনিস আলমগীরের মত সাংবাদিক বা আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খানের মতো সাবেক সচিব সরকারের সমালোচনা করার কারণে জেল খাটছেন। তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা যে খুব বেড়েছে সেটাই বা কী করে বলি?

১৫. একাত্তরের সঙ্গে বিরোধ, ভূলুণ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ

গত দেড় বছরে মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে অপমানিত হতে হয়েছে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হয়েছে, নানা জায়গায় মার খেতে হয়েছে, দফায় দফায় ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে যতভাবে নিগৃহীত করা হয়েছে, গত ৫৪ বছরে আর ঘটেনি। একদিকে যখন ১০০ কোটি টাকা খরচ করে গণভবনকে জুলাই জাদুঘর বানানো হচ্ছিল, ঠিক তখনই ২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ভেঙে ফেলা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের তর্জনি, তাজউদ্দীনের মাথা দেড় বছর পরেও দেশের নানা জায়গা গড়াগড়ি খাচ্ছে। জুলাইকে একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ফেলা হয়েছে।

১০-এ ৩

২০০১ থেকে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করছি। গত দেড় বছরের মতো অস্থিতিশীল দেশ এর আগে কখনো দেখেনি। মুহাম্মদ ইউনূসের পাঁড় ভক্ত ছিলাম আমি নিজেও। তার বিরুদ্ধে ট্যাক্স ফাঁকির মামলা চলাকালে শেখ হাসিনার তীব্র সমালোচনা করে লিখেছি। ব্যক্তি জীবনে তার হয়ত অনেক সফলতা আছেও। কিন্তু শাসক হিসেবে তিনি প্রায় সব সূচকে ব্যর্থ হয়েছেন।

ফলে সরকার প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য আমার বরাদ্দ ৩/১০!