রাজধানীর অভিজাত ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৫২ নম্বর (পুরাতন)/৭১ নম্বর (নতুন), সড়ক ১২/এ প্লট। এক বিঘা আয়তনের প্লটটির বাজারমূল্য বর্তমানে শতকোটি টাকারও বেশি। এক পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন এই প্লটের মালিক। স্বাধীনতার পর ওই পাকিস্তানির মৃত্যু হলে তার স্ত্রী দেশ ত্যাগ করেন। নিয়ম অনুসারে এই সম্পত্তি সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় চলে যায়। কিন্তু সরকারি নথিতে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকার কথা থাকলেও গেজেট প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য বাধা তৈরি হয়। সেই ফাঁকেই গড়ে ওঠে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট, যেখানে কিছু ব্যবসায়ী ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যুক্ত আছেন। আমমোক্তার দলিল, আপস-মীমাংসা আর প্রভাবের ছায়ায় ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিত্যক্ত ঘোষিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় যাওয়ার সুযোগ নেই। তবু ধানমন্ডির এক বিঘার প্লটটি ঘিরে যে নাটকীয়তা, তা রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের এক উদ্বেগজনক নজির হয়ে উঠেছে। দীর্ঘসময়েও কোনো গণতান্ত্রিক সরকার এই সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় দেয়নি; কিন্তু গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছায়ায় গড়ে ওঠা একটি বিশেষ সিন্ডিকেট জমিটি অবমুক্ত করে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করেন।
তথ্য বলছে, নিয়ম অনুযায়ী বাড়িটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় থাকার কথা। তালিকাভুক্ত থাকলেও গত ৫৫ বছরে এর গেজেট প্রকাশ হয়নি। সেই সুযোগে একাধিক পক্ষ বাড়িটির মালিকানা নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। বিভিন্নভাবে মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলাও করা হয়।
নথিপত্র বলছে, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৫২ নম্বর (পুরাতন)/৭১ নম্বর (নতুন), সড়ক ১২/এ-এর এক বিঘা জমির মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ কাজেম বেয়াদ। স্বাধীনতার আগে তিনি সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সে (সিআরপিএফ) কর্মরত ছিলেন। তিনি ইরানি নাগরিক শহরবানু জেওয়ার সুলতানকে বিয়ে করেন। স্বাধীনতার পর কাজেম বেয়াদের মৃত্যু হলে তার স্ত্রী লন্ডনে চলে যান। যাওয়ার সময় বাড়িটির দেখভালের দায়িত্ব দেন ভাড়াটিয়া বেগম ওয়াহিদা খানমকে। দীর্ঘদিন মালিক দেশে না ফেরায় এবং নিজে ভোগদখলে থাকায় ওয়াহিদা খানম বাড়িটির মালিকানা দাবি করেন। তার দাবি, ১৯৭৩ সালে শহরবানু জেওয়ার সুলতান বেয়াদের সঙ্গে তার বিক্রয়চুক্তি ও বায়না সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে লন্ডন দূতাবাসের মাধ্যমে শহরবানুর কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার দাবি করেন হামিদউদ্দিন আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। যদিও কালবেলার অনুসন্ধান বলছে, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার যে কাগজ দেখানো হয়েছে, সেখানে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক চেষ্টা করেও শহরবানুর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। এমনকি বর্তমানে তিনি জীবিত নাকি মৃত, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যদিও আইন অনুযায়ী পরিত্যক্ত সম্পত্তির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সেই আমমোক্তার দলিলের ভিত্তিতে বাড়িটির মালিকানা দাবি করেন হামিদউদ্দিন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব চলার পর মামলা হয়। মামলা চলমান থাকাকালেই মন্ত্রণালয় এবং প্রভাবশালী একজন ব্যক্তির মধ্যস্থতায় দুপক্ষ সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপর প্রতি পদে পদে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সম্প্রতি মূল্যবান এ জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়া হয়।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিবরা বলছেন, যেসব পাকিস্তানি বা বিদেশি নাগরিক স্বাধীনতার পর দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, আইন অনুযায়ী তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অধীনে ন্যস্ত হওয়ার কথা। এসব সম্পত্তির বৈধ ব্যক্তিগত মালিকানা থাকার সুযোগ নেই। ফলে কোনো ব্যক্তির এ ধরনের বাড়ি বা জমির মালিকানা দাবি করা আইনের পরিপন্থি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাষ্ট্র চাইলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় গৃহায়নের পরিত্যক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একটি বাড়ির ক্ষেত্রে ২০০১ সালে কীভাবে অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তার দলিল সম্পাদিত হলো? আরও বিস্ময়ের বিষয়, প্রায় ২৫ বছর পর সেই আমমোক্তার দলিলই আবার মন্ত্রণালয় রিসিভ করেছে। দলিলে আমমোক্তার গ্রহীতা হিসেবে নাম রয়েছে হামিদউদ্দিন আহমেদের।
যেহেতু বাড়িটি জাতীয় গৃহায়নের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় ছিল, সেক্ষেত্রে সরকারের তালিকাভুক্ত সম্পত্তি ব্যক্তির নামে অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তার দলিল করা হলো কোন আইনি ভিত্তিতে? খোদ সরকারের প্রকল্পভুক্ত একটি বাড়ির ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কীভাবে এ ধরনের দলিল নিবন্ধন করল? পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ই বা কীভাবে হামিদউদ্দিন আহমেদকে আমমোক্তার হিসেবে স্বীকৃতি দিল?
কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, অধিগ্রহণের জন্য চিহ্নিত সরকারের ১০টি পরিত্যক্ত বাড়ির তালিকায় এ বাড়িটির নামও ছিল। গৃহায়ন অধিদপ্তর ধানমন্ডি এলাকায় একটি আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করলে সেখানে এ বাড়িটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে অধিগ্রহণের তালিকায় নাম থাকলেও কার্যকর অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বহু বছর ধরে সরকারের তালিকায় থাকা সত্ত্বেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীনদের প্রভাব খাটিয়ে একাধিক পক্ষ বাড়িটির দখল নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
তথ্য বলছে, দীর্ঘবছর ধরে একটি পক্ষ মূল্যবান এ জমি দখলের চেষ্টায় ছিল। বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে এসে জমিটি ব্যক্তি মালিকানায় নিতে সক্ষম হয় চক্রটি। আর এই কাজে সহায়তা করেন মন্ত্রণালয়েরই কয়েকজন কর্মকর্তা । তালিকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ দুজন কর্মকর্তাও রয়েছেন।
এই জমি নিয়ে হওয়া মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ভোগদখলে ছিলেন শহরবানু জেওয়ার সুলতান বেয়াদ। তিনি বায়নাপত্র দলিলের মাধ্যমে ওয়াহিদা খানের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করে সরেজমিন বুঝিয়ে দিলেও সাব-কবলা দলিল করে দেননি। এ কারণে ১৯৭৩ সালে শহরবানুর বিরুদ্ধে মামলা করেন ওয়াহিদা খান। একই বছর আদালত তার পক্ষে বিশেষ নির্দেশনা দেন। পরে ১৯৭৪ সালে শহরবানু সাব-কবলা দলিল (নং ০৯৬১৫) সম্পাদন করে ওয়াহিদা খানের নামে প্রদান করেন। এদিকে, ১৯৭৩ সালের দেওয়ানি মামলার রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ৩ জুলাই নতুন করে দেওয়ানি মামলা করা হলে তা বদলি হয়ে ৩৩৪/১৯৯৭ নম্বর মামলায় রূপান্তরিত হয়। মামলাটি চলমান থাকাকালেই আমমোক্তারের সূত্র ধরে কথিত মালিক হামিদউদ্দিন আহমেদ ও ওয়াহিদা খানের মধ্যে ২০০৯ সালে আপস-মীমাংসা হয়। ওই সমঝোতায় ১০ কাঠা জমির মালিকানা ওয়াহিদা খানের বলে উল্লেখ করা হয়। পরে ২০১১ সালে মামলার বাদীসহ নালিশকৃত ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। রেজিস্ট্রিকৃত বিক্রয়চুক্তির মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা বায়না হিসেবে নগদ গ্রহণ করা হয় এবং তা বিবাদীদ্বয়কে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৫২ (পুরাতন)/ ৭১ (নতুন) নম্বর প্লটটি চারপাশে বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা। সামনে কয়েকটি দোকানও রয়েছে। বাউন্ডারি দেয়ালে লেখা রয়েছে ‘নাফকো প্যালেস-৭১’। ‘নাফকো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাট বুকিংয়ের জন্য বিভিন্ন লোভনীয় অফার দিচ্ছে এবং যোগাযোগের জন্য একাধিক ফোন নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো চুক্তিপত্র জমা দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো নথি নেই এবং এ বিষয়ে কোনো অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্লটটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলমান এবং একাধিক ব্যক্তি মালিকানা দাবি করছেন। বৈধ মালিক নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের কোনো চুক্তি সম্পূর্ণ অবৈধ। বৈধ মালিকানা নিশ্চিত না হয়েও কোনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান কার সঙ্গে চুক্তি করছে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণের আগে চুক্তিপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্লটের ক্ষেত্রে এমন কোনো কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়নি। প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ ছাড়াই আমমোক্তার দলিলধারীর সঙ্গে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চুক্তি আইনগতভাবে অবৈধ বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।
জানতে চাইলে নাফকো রিয়েল এস্টেট কোম্পানির হেড অব মার্কেটিং রেজাউল করিম রাজ কালবেলাকে বলেন, আমরা টাকা দিয়ে হামিদউদ্দিন আহমেদের থেকে সম্পূর্ণ জায়গা কিনে নিয়েছি। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেশি এগোতেও বারণ করেন। পরিত্যক্ত সম্পত্তি আপনারা কীভাবে ক্রয় করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেকেই আছেন এর সঙ্গে, বেশি এগোয়েন না। ভালো হবে না।
কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, মন্ত্রণালয় যে আমমোক্তার দলিলের কপি গ্রহণ করেছে, সেখানে দাতা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে শহরবানু জেওয়ার সুলতানা, স্বামী: মোহাম্মদ কাজেম বেয়াত, পিতা: মোহাম্মদ আব্বাস, পাসপোর্ট নম্বর: V13369129। গ্রহীতা হিসেবে নাম রয়েছে হামিদউদ্দীন আহমেদ–এনআইডি: ২৬৯১৬৪৯১২০; পিতা: মৃত মহিউদ্দিন ভূইয়া, মাতা: রাশিদা খাতুন; ঠিকানা: বাড়ি নং–১০২, রোড নং–৯/এ, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ঢাকা। দলিলের নম্বর ৯৪৭/০১ এবং তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০০১।
এদিকে ১৩ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বলা হয়, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার প্লট নং-২৫২ (পুরাতন), ৭১ (নতুন), রোড নং-২২ (পুরাতন), ১২/এ (নতুন)—মোট এক বিঘা জমির ক্ষেত্রে (মূল প্লট অবিভক্ত ও অবিভাজ্য রেখে) ২৭ এপ্রিল ২০০১ তারিখের ১৪৭/০১ নম্বর অপ্রত্যাহারযোগ্য জেনারেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের ভিত্তিতে হামিদউদ্দিন আহমেদকে আমমোক্তার হিসেবে নিযুক্ত করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, মূল লিজ দলিলের সব ধারা, উপধারা ও শর্ত তার ওপর প্রযোজ্য হবে এবং তিনি তা মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন। তবে আবেদনকারীদের দাখিলকৃত কাগজপত্রে ভবিষ্যতে কোনো গরমিল, জালিয়াতি বা সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনগত নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত হলে এ আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে এবং দায়ভার আমমোক্তার দাতা ও গ্রহীতার ওপর বর্তাবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো দায়-দায়িত্ব থাকবে না বলেও উল্লেখ করা হয়।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুকূলে ঢাকার ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন পরিত্যক্ত বাড়িতে আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন মিরপুর বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী। চিঠিতে বলা হয়, এলএ কেসভুক্ত প্লট/বাড়িগুলোর বিপরীতে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ নির্ধারিত মূল্য ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক পরিশোধ করেছেন। কিন্তু এখনো জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বাস্তব দখল হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে যে উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
চিঠিতে প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়নের স্বার্থে অধিগ্রহণকৃত অবশিষ্ট পরিত্যক্ত প্লট/বাড়িগুলো জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বাস্তব দখল হস্তান্তর, গেজেট প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। তবে ওই তালিকা থেকে ধানমন্ডির এই প্লটটিকে বাতিল তালিকায় দেখানো হয়েছে।
এরপর গত বছরের ৯ ডিসেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি নিঃশর্ত গেজেট জারি করে। ওই গেজেটেও ধানমন্ডির আলোচিত বাড়িটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন নম্বর: ২৫.০০.০০০০.১২৩.২২.০০৪.২৫.৮৬৫, যা অনুচ্ছেদ (৭) এর অধীন প্রণীত (তপশিল-অংশ-১)।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা মহানগরীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকা এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা ও ষোলশহর পুনর্বাসন এলাকা; এ ছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন গুলশান আবাসিক এলাকা, শ্যামপুর পুনর্বাসন এলাকা, উত্তরা আবাসিক এলাকা, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প, নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা এবং ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প—এসব এলাকার একটি তালিকা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়।
উক্ত তালিকায় ধানমন্ডির প্লট নং ২৫২ (পুরাতন), ৭১ (নতুন), সড়ক নং ১২/এ, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা—এই প্লটটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অনুচ্ছেদ (৬)-এ উল্লেখ করা হয়েছে—যেসব আবাসিক প্লট বা ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং উক্ত বিরোধে সরকারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট; যেসব প্লট, ফ্ল্যাট বা বাড়ি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে কিন্তু ২৮/০৩/১৯৮৮ খ্রি. তারিখের পর তা পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা হয়নি; এবং যেসব আবাসিক প্লট বা ফ্ল্যাট জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুলাই ২০২৪ সময়কালে বিশেষ বিবেচনায় বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে—সেসব সম্পত্তিও এই প্রজ্ঞাপনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনার শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালবেলাকে বলেন, জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। হামিদউদ্দিন আহমেদের নামের এক ব্যক্তির হাতে ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওয়াহিদা খানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়। তবে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। মামলায় যে বাড়ির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া যায়নি হামিদউদ্দিন আহমেদেরও।
তবে ওয়াহিদা খানের থেকে ক্রয়সূত্রে মালিক দাবি করা আবু তাহের আল মামুন নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি কালবেলাকে বলেন, আমি ক্রয়সূত্রে এই জমির মধ্যে ১০ কাঠার মালিক। কিন্তু হামিদউদ্দিন আহমেদ নামের জনৈক ব্যক্তি এই জমির মালিকানা দাবি করছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়া রয়েছে। কেউ এই জমি আপাতত বিক্রি করতে পারবে না।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি আমি জানতাম না। পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ার সুযোগ নেই। অবশ্যই বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অবমুক্ত করা হলেও তা বাতিল করে ফের পরিত্যক্ত তালিকায় নেওয়া হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর কালবেলাকে বলেন, আমরা যেহেতু নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। তাই বিষয়টি জানি না। তবে খবর নিয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।