Image description
নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠি । নির্বাচন দিতে আইনি কোনো জটিলতা রয়েছে কি না জানতে আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি। আইনি মতামত পাওয়ার পর সব প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হবে।

সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের কোনো পর্যায়েই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। গত এক-দেড় বছরের এই শূন্যতায় সেবা পেতে নানা পর্যায়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নাগরিকদের। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের দায়িত্ব এখন এসব নির্বাচন দ্রুত শেষ করে সব জায়গায় জনপ্রতিনিধি বসানো।

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা হচ্ছে। যদিও এই রোডম্যাপ এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন দিতে আইনি জটিলতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। মামলার কারণে কোন কোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন আয়োজনে আইনি বাধা রয়েছে, সে তথ্য এবং স্থানীয় সরকারের কতটি প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের সময় পার হয়েছে, সেসব তথ্য হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইন মন্ত্রণালয় থেকে আইনি মতামত এবং মাঠ প্রশাসনের কাছ থেকে মামলা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর কোন নির্বাচন কবে হবে, সে রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হবে। এখন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পর্যায়ে বিষয়গুলো আলোচনার মধ্যে রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর অনেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পালিয়ে যান। এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। ওই বছরের ১৯ আগস্ট ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৭ উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে সরকার। দেশের ৪ হাজার ৫৫৪টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে যাঁরা পালিয়ে যান তাঁদের জায়গায় প্যানেল মেম্বার এবং অনেক জায়গায় সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাকি ইউপির চেয়ারম্যানরা দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন।

ফলে এখন ইউপি ছাড়া সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আদালতের আদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শাহাদাত হোসেন। ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ধাপে ধাপে নির্বাচন হওয়ায় অনেক ইউপির চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার আইন সংশোধন করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। অন্তর্বর্তী সরকার আইন সংশোধন করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের পথ বন্ধ করে গেছে। বিএনপি সরকার কীভাবে এসব নির্বাচন করবে, এখন তাদের সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে হলে আবার আইন সংশোধন করতে হবে।

জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন কার্যক্রম শুরু করতে চাইছে সরকার। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান গতকাল সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন করতে আইনগত জটিলতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমরা আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে আইনি মতামত চেয়েছি। তাদের মতামত পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনকে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর কোন নির্বাচন হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে মামলার কারণে নির্বাচন করা যাবে না, মাঠ প্রশাসনের কাছে আমরা সে তথ্য চেয়েছি।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, সিটি করপোরেশনের পর পৌরসভা নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কারণ উপজেলা পরিষদ থেকে পৌরসভার নির্বাচন করাটা একটু সহজ। পৌরসভার পর জেলা পরিষদ এবং এরপর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা রয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌরসভা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খোন্দকার মো. নাজমুল হুদা শামিম বলেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকার পরিচালকদের চিঠি দিয়ে পৌরসভা-সংক্রান্ত তথ্য দিতে বলেছি।’

আইনি জটিলতা কোথায়

আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৮০ দিনের মধ্যে এবং পৌরসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন করতে হয়। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার কত দিন আগে ইউপি নির্বাচন করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা আইনে রাখা হয়নি। কোনো কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নির্বাচন না হলে সরকার চাইলে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান পরিষদকে সীমিত সময়ের জন্য দায়িত্বে রাখতে পারে অথবা প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার পর দেড় বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো জটিলতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ মতামত চাওয়া হয়েছে। আইনি দিক খতিয়ে না দেখে নির্বাচন করলে পরে প্রশ্ন উঠতে পারে।

কর্মকর্তারা জানান, কোনো কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মারা যাওয়ার কারণে সেখানে আবার নির্বাচন হয়েছে। কোথাও কোথাও আইনি জটিলতা শেষ করে দেরিতে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়েছিল। ফলে স্থানীয় সরকারের কতগুলো প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হয়েছে, আর কতটির মেয়াদ আছে, মাঠপর্যায় থেকে এখন সে তথ্য সংগ্রহ করছে মন্ত্রণালয়। এসব তথ্য পাওয়ার পর নির্বাচন নিয়ে রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হবে।

যথাসময়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন

হঠাৎ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে গতকাল বিএনপির নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ছয় সিটিতে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সঠিক সময়েই হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল সংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে যাচ্ছে কি না? জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘না। আমরা সরকারের তরফ থেকে একটা সঠিক সময়ে এ নির্বাচনগুলো দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’