Image description
সংসদ অধিবেশন শুরু ১২ মার্চ । অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩২ অধ্যাদেশের বেশির ভাগ আইনে পরিণত হচ্ছে না ।

১৮ মাস দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩২ অধ্যাদেশের বেশির ভাগ আইনে পরিণত হচ্ছে না। বিএনপি জোট সরকারের অনীহার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। আগামী ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি। ওইদিন বেলা ১১টায় শুরু হবে বর্তমান সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন। এজন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে সংসদ সচিবালয়। যেসব অধ্যাদেশ নিজেদের সংস্কারনীতি ও নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেসব অধ্যাদেশ এড়িয়ে যাওয়ার পন্থা নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াসহ সব কাজের সঙ্গে বিএনপি পূর্ণ একমত ছিল না। রাষ্ট্রের গুণগত সংস্কার ও জনস্বার্থমূলক অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের মধ্যে অর্ধশতাধিক অধ্যাদেশ হয়তো আইনে পরিণত হতে পারে। বাকিগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, ফৌজদারি অপরাধ, দুর্নীতি দমন, অর্থ পাচার, জনপ্রশাসন ও শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার, অর্থনীতি, রাজস্ব, কর ও বাজেট, ব্যাংকিং, আর্থিক খাত ও নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও সুশাসন বিষয়ে এসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করার আগে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওই অধ্যাদেশের আসলে দরকার আছে কি না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মন্ত্রীকে প্রথম সেই সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। কোনো অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের প্রয়োজন হলে তার খসড়া মন্ত্রিসভায় ওঠাতে হবে। মন্ত্রিসভায় আলোচনার পর খসড়া পাস হলে আইনে রূপান্তরের জন্য তা সংসদে যায়। বিগত সরকারের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে- অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ-২০২৪। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের পদমর্যাদা, ক্ষমতা এবং কার‌্যাবলি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশে সংশোধন আনা হয়েছে।

জেলা ও উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪ : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও সংস্কারের জন্য এ অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়। আইনি সহায়তা প্রদান, বন সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণী নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও-২০২৪-২৫ সময়ে জারি করা হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির জারি করা এসব অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে আইনে রূপান্তর করতে হবে। না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ওই বছরে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগে পর্যন্ত ৩৫টি অধ্যাদেশ জারি করে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালনের ৫৫৯ দিনে মোট ১৩২টি অধ্যাদেশ জারি করে। এর আগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন আনতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। 

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে গঠিত নবম সংসদে ১২২টি অধ্যাদেশকেই একসঙ্গে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়। এরপর অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করে। পরে সেগুলোকে প্রক্রিয়া অনুযায়ী আইনে রূপান্তর করা হয়। অন্য অধ্যাদেশগুলো সংসদ অনুমোদন না দেওয়ায় সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশ মূলত এক ধরনের আইন, যেটি রাষ্ট্রপতি জারি করে থাকেন।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভেঙে গেলে বা সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন মনে করলে তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রয়োজনে জারি করার পর সেই অধ্যাদেশটি পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের প্রথমদিনেই উত্থাপন করা হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচিত-সমালোচিত দেড় বছরের শাসনকাল। এর মধ্য দিয়ে দেশ আবার প্রবেশ করল সংসদীয় গণতন্ত্রে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয়। এ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।