জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্দলীয় পদ্ধতিতে হতে পারে এবারের স্থানীয় নির্বাচন। প্রথমে ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এপ্রিল-জুনের দিকে স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশনের ভোটের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে নির্বাচন কমিশন। ধারণা করা হচ্ছে- স্থানীয় নির্বাচন আবারো নির্দলীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাবে বিএনপি। ঐকমত্য কমিশনের সংলাপেও বিএনপি’র অবস্থান ছিল নির্দলীয় পদ্ধতিতে হতে হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এদিকে দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় শেরপুর-৩ আসনে ভোটগ্রহণ ও বিএনপি চেয়ারম্যানের ছেড়ে দেয়া বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ করে। ওই সময় ১২ সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৭ উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪ জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। তাদের জায়গায় বসানো হয় প্রশাসক। নির্বাচিত এসব জনপ্রতিনিধিদের বেশির ভাগই ছিলেন আওয়ামী লীগের, অভ্যুত্থানের পর তারা আত্মগোপনে চলে যান। এরই মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি স্থানীয় সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, কিছু মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার দুই সিটি এবং ২০২১ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে নির্বাচন হয়। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকেও ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ঝড়-বৃষ্টির কারণে আমরা পরিকল্পনা করছি বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনে ১৪ই এপ্রিল অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের আগেই নির্বাচন আয়োজন করবো।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, আমার জানামতে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মেয়র প্রার্থী পদে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে। এখন সংসদ বসবে। সংসদ বসার পর এই বিল বা অর্ডিন্যান্স যদি রেটিফাই (অনুমোদন) হয়, তবে সেভাবেই নির্বাচন হবে। আর যদি পরিবর্তন হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যায়, তবে অন্যরকম হবে। আমরা মূলত সংসদ অধিবেশনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি বলেন, যেহেতু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তাই স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বহাল থাকবে কিনা- তা কার্যত বিএনপি’র অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে। পাশাপাশি তিনি সংরক্ষিত নারী আসন ও স্থগিত উপনির্বাচন সংক্রান্ত কমিশনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান। রমজানের সময় ফেব্রুয়ারি-মার্চে সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট শেষ করে উপনির্বাচন করা হবে। এরপরই এপ্রিল-জুনের দিকে স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশনের ভোটের বিষয়ে চিন্তাভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদের উপনির্বাচনের পর পরই স্থানীয় সরকারের সিটি ভোট হয়ে যাবে। স্থানীয় সরকারের জেলা, উপজেলা, পৌরসভার ভোটও রয়েছে। মেয়াদ বিবেচনায় ধাপে ধাপে নির্বাচন হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভোট আগে হবে, এসব নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সাংবাদিকদের বলেন, ইতিমধ্যে আমরা সিটি (সিটি করপোরেশন) নির্বাচনের বিষয়ে চিঠি পেয়েছি। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আমরা হয়তো বা আগামী সপ্তাহের মধ্যে কমিশনের সহকর্মীদের নিয়ে সিটির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবো। এবং সেই অনুযায়ী যথাশিগগিরই সম্ভব নির্ধারিত তারিখ এবং সময়ে ইনশাআল্লাহ্ আমরা আবার একটা সুন্দর নির্বাচন করবো। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগের সময়ে নির্বাচিত চারটি স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণ করলেও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের এখনো অপসারণ করা হয়নি। তবে তাদের অনেকেই কারাবন্দি, আবার অনেকেই এলাকাছাড়া।
জামায়াতে প্রস্তুতি
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আগেই প্রার্থী ঠিক করেছে দলটি। সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে শিগগিরই। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে নতুন প্রার্থী খুঁজছে দলটি।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে ঢাকার দুই সিটির ১২৯টি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর বাছাই করেছে জামায়াত। এই নেতারা তখন থেকেই ওয়ার্ড পর্যায়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। সংসদ নির্বাচনের সময়েও নিজেদের প্রচার চালান। এদিকে ঢাকায় মেয়র পদে জোট শরিকদের ছেড়ে দেয়ার সম্ভাবনা নেই। কাউন্সিলর পদে সমঝোতা হতে পারে জামায়াতের।
দল গোছাতে ব্যস্ত এনসিপি: স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করতে কাজ করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল গোছানোর কাজে মনোনিবেশ করছেন কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা। এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায়ের কমিটিগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করা, সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শক্তিশালী করতে বেশি সময় দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় কার্যক্রম শুরু করতে আগামী ২৬শে ফেব্রুয়ারি বিশেষ বৈঠকে ডেকেছে দলটি। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
দলীয় সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নয়, বরং সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে এনসিপি। তাই ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো পুনর্গঠন, নতুন নেতৃত্ব সামনে আনা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রস্তুত করার কাজে মনোযোগ দিয়েছে এনসিপি।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তের পর দলের ভেতরে যে সাংগঠনিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাও করছে দলটি। ওই সময় দল থেকে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের একটি অংশ আবার দলে ফিরে আসছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
দলীয় নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক ঐক্য পুনর্গঠন এবং তৃণমূলকে সক্রিয় করতে পারলে নির্বাচনী মাঠে দল আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহাবুব আলম মানবজমিনকে বলেন, সংসদ নির্বাচনের আগে যারা পদত্যাগ করেছিলেন। তাদের অনেকেই এখন দলে ফিরতে চেষ্টা করছেন। অনেকেই ইতিমধ্যে দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, আগামী ২৬শে ফেব্রুয়ারি আমরা গুরুত্বপূর্ণ সভা ডেকেছি। ওই সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে। নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনা ও আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে সভায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নেবো, আগামীতে কী কী করবো, কী কী করা উচিত।