Image description
বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশই স্বাভাবিক সম্পর্কের কথা বলছে, ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিচ্ছে উভয় পক্ষ, রেল যোগাযোগ আবার চালু হতে পারে শিগগির, বিশ্লেষকেরা বলছেন আবেগ নয়, বাস্তবতা বিবেচনায় এগোতে হবে

দেড় বছরের অস্বস্তিকর দূরত্বের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবার স্বাভাবিকতার পথে এগোচ্ছে—এমনই ইঙ্গিত মিলছে দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতায়। স্থবিরতার এই সময়টিকে ‘জমে থাকা বরফ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, সম্পর্কের সেই বরফ আবার গলতে শুরু করেছে, তবে তা ধীরে এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে।

বাংলাদেশ-ভারত সস্পর্ক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, ‘ভারত আগেই বলেছিল, তারা কেবল নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই সম্পর্ক করবে। সেটাই হয়তো এখন একটু একটু কিছু করে শুরু হয়েছে।’

প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক ভয়ানক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর। অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেড় যুগের এক বিশেষে প্রেক্ষাপটের পর এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তার সঙ্গে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে দিল্লির অবস্থানে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ভারতও তার দিক থেকে নিজেদের মতো করে প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকে। সব মিলিয়ে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকা, বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা ও ভিসা জটিলতায় জন-অসন্তোষ বেড়ে যায় বহুগুণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীন-ভারত প্রতিযোগিতাও সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এর সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দুই দেশেই উত্তেজনা বাড়ায়। ফলে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকলেও আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্নে ভারতের দিক থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় আছে তারা।

দেশে নির্বাচনের পর গত সপ্তাহে দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। শপথ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সব দেশের সঙ্গে সমমর্যাদা নিয়ে। সব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে, বন্ধুত্ব থাকবে; কিন্তু সেটা হবে সমতার ভিত্তিতে, পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে।’

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভিসা ও রেল চলাচলের বিষয় এখন আলোচিত হচ্ছে। এটা সম্পর্ক উন্নতির ভালো লক্ষণ। তবে পুশ ইন, বর্ডার কিলিং বা পানিবণ্টনের মতো বিষয়গুলোর ওপরই নির্ভর করবে, সম্পর্কের উন্নতি কতটা হলো।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনগুলো ভিসা কার্যক্রম কঠোরভাবে সীমিত করে। এটা আরও প্রকট হয় গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ মিশনের সামনে বিক্ষোভ, এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটে। এরপর নয়াদিল্লি, আগরতলা ও কলকাতা থেকে ভারতীয়দের ভিসা দেওয়া সাময়িক বন্ধ করা হয়েছিল। ভারতও বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া একেবারের সীমিত করে আনে। এতে দুই দেশের মানুষে মানুষে যোগাযোগে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশে নতুন সরকার আসার পর দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে ভিসা পরিষেবায়। গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভারতীয়দের ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই দিন সিলেটে ভারতের মিশনের জ্যেষ্ঠ কনস্যুলার কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ দাস সাংবাদিকদের বলেছেন, ভিসা পরিষেবা পূর্ণমাত্রায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে তাঁর দেশ। বর্তমানে মেডিকেল ও ডাবল-এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হচ্ছে। পর্যটনসহ অন্যান্য ভিসা শিগগির চালু করা হবে।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ভিসা নিয়ে এই পারস্পরিক পদক্ষেপ আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তারই অংশ। ঢাকায় নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সে দেশের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি হস্তান্তর করেন।

এরপর শুক্রবার দিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করে এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী।

অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব ও নতুন সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথে বাধা হবে না। তাঁর মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনো ‘একক ইস্যুতে’ আটকে থাকবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন সরকারের বাস্তববাদী অবস্থানের ইঙ্গিত—প্রতিবেশী সম্পর্ককে আবেগ নয়, কৌশল দিয়ে পরিচালনার প্রয়াস। এই বার্তা কেবল সৌজন্যমূলক নয়; বরং সরকার পরিবর্তনের পর সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কৌশলগত ইঙ্গিত।

সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হলো যোগাযোগ। সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ আবার চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দেশের স্বার্থ বিবেচনায় ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

রেল যোগাযোগ আবার চালু হলে বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এটি হবে রাজনৈতিক আস্থার একটি বাস্তব পরীক্ষা।

সবশেষ গতকাল শনিবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কৃত্রিম নয়, অকৃত্রিম। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যৌথ ঐতিহ্যের উল্লেখ করে তিনি দুই দেশের মানুষের গভীর ঐতিহাসিক বন্ধনের কথাও স্মরণ করেন।

কূটনৈতিক মহল বলছে, ভিসা, রাজনৈতিক বার্তা, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা ও যোগাযোগ পুনর্বিবেচনা—সব মিলিয়ে দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের পথে হাঁটছে। তবে এ প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও হিসেবি।

তবে কেউ কেউ বলছেন, এই বরফ গলা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় রূপ নেবে। আবার কেউ বলছেন, এটা আঞ্চলিক রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনার সম্পর্কে শীতলতা ফিরিয়ে আনবে। তবে দুই দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে আপাতত আশাবাদী সুর, যদিও সেটা সতর্ক আশাবাদ হিসেবেই এগিয়ে যাচ্ছে।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘খেয়াল রাখতে হবে সম্পর্কে যেন ভারসাম্য থাকে। অতীতে আমরা দেখেছি, দুই দেশের সম্পর্ক বলতে ছিল কেবল বিশেষ একটি দলের সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে নয়। সে জায়গা থেকে ভারতকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে সম্পর্ক টেকসই হবে না। সম্পর্ক হতে হবে জনগণের সঙ্গে, কোনো দল বা ব্যক্তির সঙ্গে নয়।’