Image description

ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবার ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনি একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর সেখানেই দাঁড়িয়ে ভাষাশহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন; যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।

প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণের পরপরই শহীদ মিনার ত্যাগ করে থাকেন। তবে এবার সেই প্রথার বাইরে গিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেই দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি দেশের ইসলামী চিন্তাবিদরা এমন উদ্যোগকে ধর্মান্ধতা নয়, বরং শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় একজন মুসলমানের সঠিক করণীয় হিসাবে দেখছেন। তারা বলছেন, এক ধরনের সাংস্কৃতিক চাপে দোয়া করার এই সাহস এতদিন কেউ না দেখালেও তারেক রহমান সেই পথ খুলে দিয়েছেন। তারেক রহমানের পরে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সংসদের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরাও শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, শহীদদের জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রীর দোয়া ও মোনাজাত করার ঘটনা বেশ ইতিবাচক। এতে নেতিবাচক কিছু নেই। কারণ তিনি ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, আবার তাদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়াও করেছেন। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর মানবিক ও ইসলামী-দুই ধরনের মূল্যবোধের পরিচয় ফুটে উঠেছে। এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ অত্যন্ত সাহসী এবং ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করছি।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইনের মতে, জাতীয় শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পাশাপাশি শহীদদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, অতীতে শহীদ মিনারে শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হতো। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে শহীদদের জন্য দোয়া করার সংস্কৃতি চালু করার জন্য সরকারি এবং বিরোধী দল প্রশংসার দাবি রাখে। শহীদদের জন্য দোয়া করা ইবাদতের অংশ, যা এবার জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে এটি পারস্পরিক সহনশীলতা ও সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

শুক্রবার একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করার পরপরই সেখানে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুরুতে তিনি একা শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি বেদিতে দাঁড়িয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে মোনাজাত করেন। মোনাজাত পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের জ্যেষ্ঠ ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা নাজির মাহমুদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এ সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্যও বিশেষ দোয়া করা হয়। পাশাপাশি দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সফলতা কামনা করা হয়।

এদিকে এ ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকেও ব্যাপক আলোচনা ও প্রশংসা দেখা গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো সরকারপ্রধানকে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে দাঁড়িয়ে এভাবে মোনাজাত করতে দেখা যায়নি। অতীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। তারেক রহমানের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেলেও বেদিতে দাঁড়িয়ে দোয়ার নজির ছিল না।

প্রধানমন্ত্রীর পর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দলটির কোনো শীর্ষ নেতার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সশরীরে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনা এটিই প্রথম। বিরোধীদলীয় নেতা হিসাবে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা বেদিতে দাঁড়িয়ে সম্মিলিতভাবে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন।

ফেসবুকে অনেকেই একে ‘প্রথা ভাঙার সাহসী উদ্যোগ’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একই স্থানে দোয়া করা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন বার্তা। আবার কেউ কেউ একে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। কারণ এর আগে কোনো সরকার বা বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতৃত্বকে এভাবে শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করতে দেখা যায়নি। প্রথম প্রহরের এ ব্যতিক্রমী দৃশ্য তাই আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।