বাস, ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও টেম্পো-লেগুনা থেকে দৈনিক প্রায় শতকোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। যার বেশির ভাগ চাঁদাবাজি। সোজা কথা, ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়। সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মী এসব চাঁদা আদায়ে যুক্ত। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে প্রতিদিন এভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। সারা দেশ থেকে যুগান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি নেই-আমি একথা কিন্তু বলিনি। আমি বলেছি-একটা হলো চাঁদা, আর একটা হলো চাঁদাবাজি। চাঁদা হলো-স্বেচ্ছায় এবং চাঁদাবাজি হলো জোরপূর্বক। আমি তো চাঁদাবাজিকে সমর্থন করিনি বা করছিও না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি একটা ফৌজদারি অপরাধ। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।’ তিনি জানান, ‘প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমবায় মন্ত্রণালয় এবং আমার মন্ত্রণালয়ে মিলে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কোথাও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে। কোথাও আবার পৌর টোলের সঙ্গে জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া সড়কে দায়িত্বপালন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং থানা পুলিশের এক শ্রেণির অসাধু সদস্য এসব চক্রের সঙ্গে যুক্ত। নিরুপায় হয়ে পরিবহণ চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর ধরে এসব চাঁদা পরিশোধ করে যাচ্ছেন।
তারা জানান, পরিবহণে চাঁদাবাজির ফলে পরিবহণ ভাড়াও বাড়ে। সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর দাম হয়ে যায় আকাশছোঁয়া। দিনশেষে সব গিয়ে পড়ে জনগণের ঘাড়ে। সমঝোতা সিস্টেমের নামে চাঁদাবাজির খেসারত দিতে হয় আমজনতাকে। এর ফলে সমাজের মধ্যবিত্তের যাপিত জীবন আরও দুঃসহ হয়ে ওঠে। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই চাঁদাবাজি আর বন্ধ হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের সদস্যদের কল্যাণের নামে এভাবে চাঁদা আদায় করা হলেও বাস্তবে যা হচ্ছে তা স্রেফ চাঁদাবাজি। এসব চাঁদার ৯০ ভাগ চালক-কন্ডাকটরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নেওয়া হয়। চাহিদামাফিক চাঁদার টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর করা ছাড়াও মারধরও করা হয়। এছাড়া মাঠপর্যায়ে থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদার টাকা কত হাত ঘুরে কোথায় যায় এবং কারা এর ভাগ পায়-সে বিষয়ে কেউ মুখে খুলতে চান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ সেক্টরের সাধারণ মালিক-শ্রমিকদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, মূলত এসব চাঁদার টাকার ওপর ভর করে স্বাধীনতার পর এক শ্রেণির মালিক-শ্রমিক নেতারা জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন। কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রীও হতে পেরেছেন। সরকার বদল হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এসব প্রভাবশালী নেতা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের আপস করে চলেন। সারা দেশে এ সেক্টরের লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিকদের পুঁজি করে রাজনীতির হাত শক্তিশালী করাসহ রাজনীতিকে জিম্মি করা হয়। বিপরীতে সাধারণ পরিবহণ শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না। তাদের রাত-দিনের ঘামঝরা অমানুষিক পরিশ্রমকে পুঁজি করে বেশির ভাগ নেতা রাজকীয় জীবনযাপন করেন। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এসব প্রভাবশালীরা কঠোর আইন করতেও বাধা দেন। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার নানা কারণে এ চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এ কারণে এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা কখনো নেওয়া হয় না। বিপরীতে সমঝোতার নামে চাঁদা নেওয়া হয় বলে এক ধরনের বৈধতা দিয়ে দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক মতবিনিময় সভা শেষে পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহণ ও সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহণের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চান না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করেন।’
এদিকে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সিটি বাসের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এসব বাস থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। এ হিসাবে সিটি বাস থেকে দৈনিক মোট চাঁদা আদায় হয় প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। আর দূরপাল্লার বাস চলাচল করে ৬০ হাজারের বেশি। এসব বাস থেকে গড়ে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। অর্থাৎ এ খাত থেকে দৈনিক মোট চাঁদা আদায় করা হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা।
এছাড়া রাজধানী ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে ১৮ হাজার। এসব থেকে দৈনিক গড়ে চাঁদা তোলা হয় ১৫০ টাকা। এ হিসাবে ঢাকার সিএনজি অটোরিকশা থেকে দৈনিক মোট চাঁদা তোলা হয় ২৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে ১৫ হাজার। সেসব রিকশা থেকে দৈনিক গড়ে চাঁদা আদায় করা হয় ৮০ টাকা করে। এ হিসাবে সেখান থেকে দৈনিক চাঁদা আদায় হয় ১২ লাখ টাকা।
একইভাবে চাঁদা আদায় করা হয় রাজধানী ঢাকায় চলাচল করা প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে। দৈনিক গড়ে ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। অর্থাৎ এ খাত থেকে দৈনিক ১৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে দেশজুড়ে চলাচল করে আরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব অটোরিকশা থেকে গড়ে ৮০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এ হিসাবে দৈনিক ৪০ কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করা হয় ট্রাক থেকে। সারা দেশে দৈনিক চলাচলকারী ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। দৈনিক গড়ে ১ হাজার টাকা করে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া টেম্পো, লেগুনাসহ এই শ্রেণির যানবাহন রয়েছে ৮ হাজারের বেশি। এসব পরিবহণ থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। যা থেকে আসে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ সব খাত মিলিয়ে প্রতিদিন পরিবহণ সেক্টর থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, ‘চাঁদা ও চাঁদাবাজি দুটোই রয়েছে সড়কে। যেহেতু সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তিনি কাজ করেন-এজন্য এ বিষয়ে তার সংগঠন এবং ব্যক্তিগতভাবে তার নিজের যথেষ্ট স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে।’ তিনি জানান, সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন নামে-বেনামে চাঁদা আদায় করছে। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও এসব চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও চাঁদা আদায় করে থাকেন।’
তিনি আরও জানান, ‘সব পরিবহণে চাঁদাবাজি হয় এমনটা বলা যাবে না। কোনোটিতে হচ্ছে, কোনোটিতে হচ্ছে না। সবমিলিয়ে গড় হিসাব করে যাত্রীকল্যাণ সমিতি বিভিন্ন সময় চিত্র প্রকাশ করেছে। এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন বেশির ভাগ পরিবহণকে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়। এক জায়গায় নয়, নানা খাতে তাদের চাঁদা দিতে হয়। সব কথা সাহস করে বলতে পারেন না তারা।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ সিস্টেম ও ডিজিটাল মামলা (ক্যামেরা দেখে মামলা) পদ্ধতি চালু করলে সড়কে পরিবহণের চাঁদাবাজি থাকবে না। বিগত সরকারগুলোকে তিনি এ বিষয়ে বারবার বললেও তারা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখেনি। উলটো তাকে নানাভাবে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হয়রানি করেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, পরিবহণ খাত থেকে সমঝোতার নামে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে, না চাঁদার নামে চাঁদাবাজি চলছে-সেটি সরকার তথা সড়ক মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে তদন্ত করে দেখা। যারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করে আনতে পারবে-তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এরপর কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করাসহ চাঁদাবাজির প্রমাণ পেলে সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থাও নিতে হবে। এছাড়া তিনি মনে করেন, বর্তমান সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যেহেতু নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন, সেহেতু এ বিষয়ে এখন তার কোনো দায় নেই। তবে তিনি এ বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে নিকট ভবিষ্যতে তার ওপর চাঁদাবাজির দায় এসে বর্তাবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু যুগান্তরকে বলেন, ২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে শ্রমিক ফেডারেশনের নামে সরাসরি কোনো চাঁদা আদায় করা হয় না। তবে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি এখনো চাঁদা তুলছে।’
তিনি বলেন, ‘শ্রমিক ফেডারেশন শ্রমিক সংগঠন পরিচালনা ও শ্রমিকদের কল্যাণের নামে আগে চাঁদা তুলত, এখন তা নেওয়া হচ্ছে না। তবে নানা নামে, নানা খাতে চাঁদা নেওয়া তো বন্ধ হয়নি। পুলিশসহ বিভিন্ন খাতে পরিবহণ মালিকদের চাঁদা দিয়ে যেতে হচ্ছে।’ তার মতে, ‘এটা সেদিনই বন্ধ হবে, যেদিন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠবে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, পরিবহণ মালিক সমিতি টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থাপনার জন্য সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতে কিছু টাকা আদায় করে থাকে। যেটা পরিবহণ মালিকরা স্বেচ্ছায় দিয়ে যাচ্ছেন। ওই টাকা টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ বহন করা হয়। এটাকে আমরা চাঁদা বলি না, এটা ব্যবস্থাপনা খরচ। সড়ক পরিবহণমন্ত্রীও এভাবে টাকা নেওয়াকে চাঁদা বলতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি তো আলোচনার ভিত্তিতে টাকা নিচ্ছে। পরিবহণ মালিকরা তা স্বেচ্ছায় পরিশোধ করছেন। যারা সমিতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদেরও পরিবহণ রয়েছে। তবে এর বাইরেও সড়কে পদে পদে পরিবহণগুলোকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর কাছ থেকে পৌরকরের পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা জোরপূর্বকভাবে আদায় করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি (হাইওয়ে পুলিশ) মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা যুগান্তরকে বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এজন্য গত দেড় বছরে মহাসড়কে চাঁদাবাজি নেই বললেই চলে। তারপরও কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে পুলিশ। তবে এখন মহাসড়ক নয়, টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে শোনা যায়।
চট্টগ্রামে ষোলো বছরে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, জেলার পরিবহণ খাত থেকে একটি চক্র বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শাহজাহান নামে জনৈক পরিবহণ শ্রমিকের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় করা একটি মামলায় এমন তথ্য সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর করা পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজির মামলার এজাহারেই কীভাবে কোন রুট থেকে কত টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে, কারা আদায় করেছেন-এর বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়। এ ঘটনার পরও পুরোনো নিয়মেই চট্টগ্রামের পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি চলছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস-টেম্পো-ট্যাক্সি-মিনিবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে বিপুল পরিমাণ এই অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সিন্ডিকেটে রয়েছে পরিবহণ শ্রমিক নামধারী ২০০ জনের একটি চক্র। লাইন পরিচালনা, প্রশাসন ম্যানেজ করা এবং শ্রমিক কল্যাণের নামে বিভিন্ন নিবন্ধিত, অনিবন্ধিত ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে তারা চাঁদা আদায় করে। তবে চাঁদার এক কানাকড়িও শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়নি। এছাড়া চট্টগ্রামে বাস-মিনিবাসের রুট রয়েছে ১৮টি। এসব রুটের বৈধ-অবৈধ গাড়ির সংখ্যা ১ হাজার ৯৪১টি। প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে ২ লাখ ৯১ হাজার ১৫০ টাকা চাঁদা উঠানো হয়। সেই হিসাবে বছরে ১০ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার এবং ১৬ বছরে ১৬৭ কোটি ৭০ লাখ ২৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। একইভাবে চট্টগ্রাম শহরে হিউম্যান হলারের রুটে রয়েছে ১৮টি। এসব রুটে বৈধ-অবৈধ গাড়ির সংখ্যা ১ হাজার ৮৬৬টি। এসব গাড়ি থেকে দৈনিক ২০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। বছরে ১ কোটি ১১ লাখ ৯৬ হাজার এবং ১৬ বছরে উঠানো চাঁদার পরিমাণ ১৬৭ কোটি ৭০ লাখ ২৪ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম শহরে চলাচলরত ম্যাক্সিমা গাড়ি রয়েছে ২ হাজার ১০০টি। প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ৫০ টাকা হারে চাঁদা নেওয়া হয়। বছরে ৩ কোটি ৭৮ লাখ এবং ১৬ বছরে এসব গাড়ি থেকে চাঁদা উঠানো হয় ৬০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পণ্য পরিবহণ মালিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে পরিবহণ খাতে চট্টগ্রামের কোথাও কোনো চাঁদা তোলা হয় না। সাংগঠনিকভাবে লাইন চালানোর জন্য মালিকরা নির্ধারিত ফি দিয়ে থাকেন। পরিবহণ সেক্টর নেতৃত্বশূন্য থাকলে শৃঙ্খলা থাকবে না।
রাজশাহীতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীতে পরিবহণ মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের নামে চলছে চাঁদাবাজি। মহানগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল এবং ভদ্রা কাউন্টার থেকে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন দুই সংগঠনের নেতারা। নাম প্রকাশ না করে রাজশাহীর একাধিক মালিক এবং শ্রমিকদের একাধিক সদস্য জানান, রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাসপ্রতি আদায় করা হয় ৬২০ টাকা। আর মালিকদের সংগঠন রাজশাহী সড়ক পরিবহণ গ্রুপ আদায় করে ২২০ টাকা। তারা আরও জানায়, শ্রমিকদের কল্যাণের নামে বাসপ্রতি ৬২০ টাকা করে আদায় করা হলেও ফান্ডে মাত্র তিনশ টাকা জমা করা হয়। আর শ্রমিকদের দুর্ঘটনা ফান্ডে জমা হয় একশ টাকা। বাকি ২২০ টাকা তছরুপ করেন শ্রমিক নেতারা। আর বাইরের যেসব বাস রাজশাহীতে প্রবেশ করে, সেসব বাসের ২৫০ টাকার চাঁদার কোনো হিসাব নেই।
রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পাখি যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগ ভিত্তিহীন। বাস থেকে যেসব টাকা নেওয়া হয়, সেগুলো বাসের সার্ভিস, কলার বয় এবং শ্রমিক কল্যাণসহ নানা খাতে ব্যয় করা হয়।
খুলনায় গণপরিবহণে সমিতির নামেই চলে চাঁদাবাজি : খুলনা ব্যুরো জানায়, জেলায় রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পরও গণপরিবহণে চাঁদাবাজির চিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। খুলনার সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০টি বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। প্রতিটি বাস নামালেই মালিক সমিতিকে দিতে হয় ৩৫০ থেকে ৫২০ টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন পয়েন্ট ও রুটভিত্তিক আলাদা চাঁদা রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থের বেশির ভাগই বাঁটোয়ারা হয় নিজদের মধ্যে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাস মালিক জানিয়েছেন, বেনাপোল থেকে কুয়াকাটা রোডে গাড়ি নামালে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় বিভিন্ন সমিতির নামে। শুধু খুলনার সোনাডাঙ্গা কাউন্টারেই বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদা দেওয়া লাগে ৫০০ টাকা। খুলনা থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসেও একই চিত্র।
এ প্রসঙ্গে পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি মোকাম্মেল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ১৫ বছর আগে প্রকৃত মালিকদের বের করে দিয়ে সমিতি দখল করে নেওয়া হয়। এখন শুধু আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও কাউন্টার ভাড়া বাবদ সামান্য কিছু টাকা আদায় করছি।
সিলেটে পরিবহণ শ্রমিক সংগঠনের বেপরোয়া চাঁদাবাজি :সিলেটের পরিবহণ খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর হাঁকডাক থাকলেও সড়ক-মহাসড়কে থামছে না চাঁদাবাজি। কেবল নাম পরিবর্তন আর রশিদের রং বদলিয়ে চলছে কোটি কোটি টাকার ‘চাঁদা বাণিজ্য’। পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে আদায় করা এই অর্থের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী চক্রের পকেটে। সাধারণ চালকদের অভিযোগ, চাঁদা না দিলে গাড়ি আটকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় নিয়মিত।সিলেট নগরের প্রবেশমুখগুলোতে অন্তত ৫টি প্রধান পয়েন্টে প্রকাশ্যে এই টাকা আদায় করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় সিলেট জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়ন এবং সিলেট জেলা ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ শ্রমিক ইউনিয়ন। কদমতলী ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি দূরপাল্লার বাসকে ‘শ্রমিক কল্যাণ তহবিল’ বা ‘পরিচালনা ব্যয়’ বাবদ ৫০ থেকে ১০০ টাকার রসিদ কাটতে হয়। হুমায়ুন রশীদ চত্বর ও তেমুখী বাইপাস থেকে পণ্যবাহী ট্রাক ও আন্তঃজেলা বাস থামিয়ে ২০ থেকে ৫০ টাকা করে ‘লাইনম্যান খরচ’ বা ‘জিপি’ (গেট পাশ) নেওয়া হয়। সিলেট-তামাবিল সড়ক (বটেশ্বর ও হরিপুর) রুটে পাথর ও বালুবাহী ট্রাকই মূল লক্ষ্য। ‘লোডিং-আনলোডিং’ বা ‘সিরিয়াল ফি’র নামে প্রতিটি ট্রাক থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। রসিদে ‘শ্রমিক কল্যাণ’ লেখা থাকলেও শ্রমিকরা এর সুফল পান না বললেই চলে। রসিদের বাইরেও রয়েছে ‘মাসিক টোকেন’ পদ্ধতি। বিশেষ করে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা এবং ছোট পিকআপগুলোকে নির্দিষ্ট সংগঠনের স্টিকার বা টোকেন ব্যবহার করতে হয়। বিনিময়ে মাসে ১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকা দিতে হয় নির্দিষ্ট লাইনম্যানদের। এই টোকেন থাকলে ট্রাফিক পুলিশের ঝক্কি থেকেও অনেকটা রেহাই পাওয়া যায়। পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, সিলেট বিভাগজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করে। যদি গড়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০০ টাকাও আদায় করা হয়, তবে দৈনিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি টাকার ওপরে। সিলেট জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতার দাবি, তারা কোনো চাঁদা নিচ্ছেন না। ইউনিয়নের সদস্যদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সামান্য কিছু টাকা ‘লেভি’ বা ‘চাঁদা’ হিসাবে নেওয়া হয়, যা শ্রম আইন অনুযায়ী বৈধ।
বরিশালের দুই বাস টার্মিনাল, নতুন বন্দোবস্তে পুরোনো চাঁদা : বরিশাল ব্যুরো জানায়, গণ-অভ্যুত্থান থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়ে বিএনপি, কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না বরিশালের দুই বাস টার্মিনাল থেকে অবৈধ চাঁদা আদায়। আওয়ামী লীগ পতনের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই দুই টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নেয় বিএনপি নেতারা। এরপর থেকে সবকিছু আগের মতোই চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তারা বলেন, ক্ষমতার হাতবদল ছাড়া বদলায়নি কিছুই। এক হিসাবে দেখা গেছে, দুই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন চাঁদা বাবদ আদায় হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। এছাড়া পর্দার আড়ালে চলে নানা পদ্ধতির চাঁদাবাজি। যার পরিমাণ বছরে কোটি টাকারও বেশি। যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তাদের পকেটেই যায় এই চাঁদাবাজির টাকা।
জানতে চাইলে পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, ‘এখানে টার্মিনালে যারা কাজ করে, মালিক সমিতির স্টাফ আছে, কাউন্টারগুলোতে যারা টিকিট বিক্রি করে, বাসগুলোর সিরিয়াল ঠিক রাখাসহ অন্যান্য কর্মচারী আছে, তাদের বেতন দেওয়ার জন্য মালিকরা একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেন। যার আয়-ব্যয়ের হিসাব সমিতি অফিসেই আছে। এর বাইরে অবৈধভাবে এক টাকা কারও কাছ থেকে নেওয়ার কোনো প্রমাণ যদি কেউ দিতে পারে তবে মালিক সমিতির সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করব।’
রংপুরে পরিবহণ খাতে বছরে ৭ কোটি টাকা চাঁদা আদায় :রংপুর ব্যুরো জানায়, রংপুর জেলায় মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন মিলে ছোট-বড় যাত্রীবাহী বাসসহ ট্রাক পরিবহণ থেকে প্রতিবছর ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বিভিন্ন খাত দেখিয়ে আদায় করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত পরিবহণ মালিক সমিতি ও ট্রাক-বাস শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন যাত্রীবাহী বড় ও ছোট বাস থেকে দুর্ঘটনা তহবিল-৭০ টাকা, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল-২০, অফিস ব্যয়-৬০ টাকা, টার্মিনাল টোল-১০০ টাকা, প্রতিটি ট্রাক থেকে ২৫ টাকা শ্রমিক তহবিলের জন্য আদায় করা হয়, যা প্রতিদিন যোগ করে টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দাঁড়ায়। যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক মিলে প্রতিদিন রংপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রায় ১৩শ গাড়ি চলাচল করে। এতে গড়ে মাসে ৫৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়। বছরে ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
রংপুর জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, শ্রমিক ও মালামালের নিরাপত্তার জন্য ২৫ টাকা করে প্রতিটি ট্রাক থেকে আদায় করা হয়। রংপুর মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের এসি সফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পরিবহণ খাতে কোনো টাকা আদায় হয় কিনা-যারা আদায় করেন তারাই বলতে পারেন। আমি এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।
বগুড়ায় মালিক-শ্রমিক সমিতির উদ্যোগে দিনে চার লাখ টাকা চাঁদা আদায় : বগুড়া ব্যুরো জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম কয়েকদিন বন্ধ থাকলেও বগুড়ায় পরিবহণ সেক্টরে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। মাঠের হিসাবে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সমিতি প্রতিদিন চার লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে। তবে দুটি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতারা দাবি করেন, মালিক ও শ্রমিক স্বার্থে তারা যা চাঁদা নেন, এর চেয়ে বেশি ব্যয় হয়।
বগুড়া জেলা বাস, মিনিবাস ও কোচ পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক হিরু চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশি অঙ্কের চাঁদা আদায় হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর সেনাবাহিনী থেকে বাসপ্রতি ১২৫ টাকা চাঁদা ধার্য করে দিয়েছে। সে হিসাবে তাদের দিনে গড়ে ৮৮ হাজার টাকা চাঁদা আদায় হয়। এর মধ্যে চেইন মাস্টার, টার্মিনাল ফি, শ্রমিক কল্যাণ, সমিতিসহ বিভিন্ন ফি রয়েছে। তিনি দাবি করেন, আদায় করা চাঁদার অধিকাংশই মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। তাই নেতাদের চাঁদা আত্মসাতের প্রশ্নই ওঠে না।
সরকারবদলেও কুমিল্লার পরিবহণের চাঁদা বহাল : কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, কুমিল্লায় সমঝোতা নয়, মালিক-শ্রমিকদের জিম্মি করে পরিবহণ সেক্টরে চলছে চাঁদাবাজি। জেলার সবকটি বাসটার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাস, মিনিবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।
সাধারণ মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, সরকারদলীয় প্রভাবশালীদের শেলটারে একশ্রেণির অসাধু মালিক এবং শ্রমিক নেতারা জিপির নামে এসব চাঁদা আদায় করছে। সরকার পরিবর্তন হলেও এখানে চাঁদা বন্ধ হয় না। শুধু হাতবদল হয়। মালিক সমিতির নামে জিপি আদায় করা হলেও এর বিন্দুমাত্র সুবিধাও পায় না সাধারণ মালিক কিংবা শ্রমিকরা।
ফারজানা পরিবহণের চালক আনিসুর রহমান বলেন, প্রতি ট্রিপে কুমিল্লা টার্মিনাল ছাড়ার আগে ২৮০ টাকা জিপি দিতে হয়। এই টাকা থেকে মালিক এবং শ্রমিকরা কোনো সুবিধা পায় না।
কুমিল্লা বাস মালিক সমিতির সভাপতি কবির আহমেদ ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, কুমিল্লায় পরিবহণ থেকে কোনো ধরনের চাঁদা আদায় করা হয় না। পরিবহণ থেকে আদায় করা জিপির টাকা দিয়ে সার্ভিসের মেইনটেন্যান্সে খরচ হয়। এছাড়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়, এটা সত্য। এসব চাঁদার টাকা বিভিন্ন প্রভাবশালী এবং প্রশাসনের লোকজন ভাগ পেয়ে থাকে।
জামায়াতের নিন্দা ও প্রতিবাদ : সড়ক পরিবহণ, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ‘সমঝোতার’ নামে চাঁদাবাজিকে কার্যত বৈধতা দেওয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের শনিবার এক বিবৃতি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, সম্প্রতি সড়ক পরিবহণ, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ‘সমঝোতার’ নামে চাঁদাবাজিকে কার্যত বৈধতা দিয়েছেন। আমি তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও অনৈতিক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
আরও বলেন, চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এটি সমাজ, অর্থনীতি ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্যে যদি এমন কোনো বার্তা যায় যে অবৈধ অর্থ আদায় বা অনৈতিক সমঝোতা গ্রহণযোগ্য-তবে তা রাষ্ট্রের জন্য কলঙ্ক। রাষ্ট্রের এমন বৈধতাদান অপরাধীকে চাঁদাবাজির মতো আরও অনেক অপরাধ করতে উৎসাহিত করবে। এতে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। জনগণ ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থেকে বঞ্চিত হবে।
এছাড়া জামায়াত আমিরের ফেসবুক স্ট্যাটাস : তাহলে কি নবগঠিত সরকারের সড়ক পরিবহণ মন্ত্রীর মাধ্যমে চাঁদাকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলো-এমন শিরোনামে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে তিনি লেখেন, তাহলে কীভাবে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে? ব্যাকরণ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সূচনাতেই বাংলাদেশ কোনদিকে যাচ্ছে? প্রিয় জনগণ, চাঁদার কালো থাবা থেকে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। এ লড়াইয়ে আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি, ইনশাআল্লাহ।
রিপোর্টটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন যুগান্তরের বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, রংপুর, কুমিল্লা ও বগুড়া ব্যুরো প্রধানরা