রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে ইফতার সামগ্রীর চাহিদা বাড়ায় মাসিক খরচও বেড়ে যায়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষদের সংসারের হিসাব মেলাতে বাড়তি কষ্ট করতে হয়। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহকর্মী ও নিম্নবেতনভুক্ত চাকরিজীবীরা বলছেন, আয় অপরিবর্তিত থাকলেও রমজানে খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয় করা তো দূরের কথা, ধারদেনাও করতে হচ্ছে অনেককে। সংযমের মাসে আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও সংযমের কথা বলা হয়। কিন্তু বাজারের এই বাড়তি ব্যয় নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সংযম নয়, বরং বাধ্যতামূলক সংকোচনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং প্রশাসনের নজরদারিতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ হবে। অন্যথায় রমজানের পুরো মাসজুড়েই হিসাব কষে চলতে হবে হাজারো পরিবারকে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছোলা, বুট, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বেগুনি, পিঁয়াজু, আলুর চপ, হালিম ও অন্যান্য ইফতার সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। ভালো মানের এক হালি লেবুর দাম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। কিছু দোকানে বড় আকারের লেবু হালি ১৫০ টাকা দামেও বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ একটি লেবুর দামই পড়ছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও মাঝারি আকারের এক হালি লেবু ২০ থেকে ৪০ টাকায় পাওয়া যেত। গত বছর রোজার শুরুতেও এক হালি লেবুর দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে।
জানা যায়, কয়েকদিন আগেও ৪০-৫০ টাকায় হালি লেবু পাওয়া গেছে এখন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। বড় আকারের হলে ১৬০ টাকা পর্যন্ত চাইছে কেউ কেউ। একটি লেবুর দামই যদি ৩০-৪০ টাকা হয় তাহলে প্রতিদিন শরবত বানানো সম্ভব নয়। শুধু লেবু নয়, ইফতার তৈরির অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। বেগুন ও শসার দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বড় আকারের বেগুনের দাম আরও বেশি। শসা বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। টমেটো ও গাজরের দামও কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব সবজির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি। পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় উঠেছে। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এসব বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
দুই সপ্তাহ আগে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল কেজিতে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। এখন তা ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেড়েছে। সোনালি মুরগির দামও বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা। সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়। খামারিরা বলছেন, মুরগির বাচ্চার দাম বেড়েছে এবং শীতে মৃত্যুহার বাড়ায় উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি রোজা শুরুর আগে চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে।
চাষের তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদা, কই, শিং, রুই ও কাতলার দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ২০০-২২০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই বা কাতলা ৪০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য মাছ-মুরগির এই মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। রোজায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুর, মাল্টা ও আপেলের। মাল্টা বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা, আর আপেল ৩৩০ থেকে ৪০০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগে এসব ফল ৫০-৮০ টাকা কম দামে পাওয়া যেত। দেশীয় ফলের মধ্যেও দাম বেড়েছে। কলার দাম ডজনে ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। পেঁপে, পেয়ারা ও বরই আগের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
মগবাজারের বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, রোজার সময় যেসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে, প্রায় সব কটির দাম বেড়েছে। রমজান এলে যেখানে দাম কমার প্রত্যাশা থাকে, সেখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সীমিত বেতনে সংসার চালাতে গিয়ে এখন হিসাব মিলছে না। রমজান উপলক্ষে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য খাদ্যপণ্যের দাম বড় চাপ সৃষ্টি করে। আয় স্থির থাকলেও খরচ বেড়ে যায়।