Image description
২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের পাহাড়, মূল্যস্ফীতির আগুন, বেকারত্ব খেলাপি ঋণ ৬.৪৪ লাখ কোটি, রাজস্ব আদায় তলানিতে, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের ধারাবাহিকতায় অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানোর বদলে বরং পরিস্থিতিকে আরো নাজুক ও ভঙ্গুর করেছে সদ্যোবিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যাংকিং খাতে ভগ্নদশা। ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতায় বিনিয়োগে মন্দা। বড় রাজস্ব ঘাটতি।

উচ্চ সুদের হারে রুগ্ণ বেসরকারি খাত-ব্যবসা-উদ্যোগ। একের পর এক কারখানা বন্ধ। লাখো মানুষের চাকরি খোয়ানো। মব সন্ত্রাস।
 
হত্যা-জেল-জরিমানা-নিরাপত্তাহীনতায় বিপন্ন জনজীবন। প্রশ্নবিদ্ধ বিদেশি চুক্তি। বাস্তবতাবিবর্জিত পে স্কেলের ইস্যু। ধারদেনা-ঋণের বোঝা।
 
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ অসংখ্য বিষয়। এসবই দেশকে অনেকটাই স্থবির করে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়েও দিয়েছে। আর এসব  ভঙ্গুর, রুগ্ণ আর বিপর্যস্ত-বিশৃঙ্খল অর্থনীতি ও দায়দেনার বোঝা পড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে। ১৮ মাসে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারাক্রান্ত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে দায়িত্ব ছেড়েছে।
 
এখন এত সব সংকট ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত তারেক রহমান সরকারকে। সামনে এই অনিবার্য কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা যায়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বর্তমানে সাতটি ‘মহাসংকট’ জেঁকে বসেছে, যার প্রতিটিই এককভাবে যেকোনো সরকারের জন্য চরম মাথাব্যথার কারণ। ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের পাহাড়, সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ২১ লাখ মানুষের কর্মহীনতা, তলানিতে নামা রাজস্ব আয়, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ইতিহাসের সর্বনিম্ন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন—এই ‘সপ্তঘাতক’ ব্যাধি নিয়েই নতুন সরকারকে হাঁটতে হবে সামনের কঠিন পথ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন সরকারকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন পে স্কেল ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর মতো কঠিন সমীকরণ মেলাতে ‘অজনপ্রিয়’ কিন্তু ‘সাহসী’ কিছু সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে।

পরবর্তী অর্থমন্ত্রীর জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নোটেও অর্থনীতির দুরবস্থার কথা স্বীকার করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শীর্ষক নোটে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘নিম্নমানের কর আদায়, উচ্চ খেলাপি ঋণ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল শাসনব্যবস্থা অর্থনীতির গভীরে প্রোথিত; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পাচ্ছে। কর আদায় দুর্বল থাকায় বড় সংকট মোকাবেলায় সরকারের সক্ষমতা কমছে এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যার সুদ পরিশোধে অর্থনীতি চাপের মুখে।

গত সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদহার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ০.৫৮ ও ০.৪৬ শতাংশ বেড়েছে; ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে গেলেও খেলাপি ঋণ, পুঁজি ঘাটতি ও শাসন দুর্বলতা রয়ে গেছে। অনিশ্চয়তায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি নভেম্বরে আগের বছরের তুলনায় ৬.৫৮ শতাংশ কমেছে। বৈদেশিক খাতে আমদানি বাড়লেও রপ্তানির প্রবৃদ্ধি শ্লথ, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে প্রত্যাশিত উৎপাদন না হওয়ায় মোট রপ্তানি চাপে রয়েছে।

২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা

নতুন সরকার এমন একসময় দায়িত্ব নিল, যখন দেশের মোট ঋণের বোঝা দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ কোটি টাকায়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য বলছে, এই ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১৬ লাখ কোটি টাকার বেশি, আর বৈদেশিক ঋণ ছাড়িয়েছে সাত লাখ কোটি টাকা। পরিস্থিতি এমন যে পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে পুনরায় নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় হবে প্রায় ১.২৫ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি।

আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত এখন ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৬ শতাংশ এখন খেলাপি। ব্যাংকগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট এবং মূলধন ঘাটতি পুরো খাতকে অস্থির করে রেখেছে। 

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের নতুন মাইলফলক

বাজারে পণ্যের আমদানি বাড়লেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, জানুয়ারি মাসে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭৭ শতাংশে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ এখন দিশাহারা।

সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো কর্মসংস্থান সংকট। এসডিজি বাস্তবায়নে সিটিজেন প্ল্যাটফর্মের জরিপ বলছে, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি বাড়লেও নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। অথচ প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী নতুন করে কর্মবাজারে প্রবেশ করে। 

কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ, বিনিয়োগ স্থবিরতা

সরকারের আয় করার ক্ষমতা বা রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র ৬.৮ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৭ শতাংশ, ভুটানের ২২ শতাংশ, এমনকি নেপালেরও ২২ শতাংশের ওপরে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে মাত্র ৫৮ শতাংশ।

বেসরকারি খাতে অনাস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই শুরু হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা গত দেড় বছরে কোনো বড় ঝুঁকি নেননি। এর ফলে শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। এই অনাস্থা কাটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত দেড় বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত দেড় বছর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। 

রিজার্ভে স্বস্তি, কিন্তু এডিপির দুর্বল বাস্তবায়ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি (বিপিএম-৬) অনুযায়ী এটি ২৯.৮৫ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের এই স্থিতি পরিশোধ ভারসাম্যের ওপর চাপ কিছুটা কমিয়ে দিলেও তা কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি আয়ের ওপর। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় এখন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে, ফলে এই রিজার্ভও খুব স্বস্তি দেবে না। 

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২১ শতাংশ, যা গত দশকের তুলনায় সবচেয়ে কম। ২০২৬ অর্থবছরের শুরুতেও একই চিত্র।

লাখ কোটি টাকার নতুন ব্যয়ের চাপ পে স্কেল

অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া নতুন পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে সরকারি কোষাগারে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার থেকে এক লাখ আট হাজার কোটি টাকার বোঝা বাড়বে, যা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপের সৃষ্টি করবে। এই বর্ধিত ব্যয় মেটাতে নতুন ঋণের বোঝা বা টাকা ছাপানোর প্রয়োজন হতে পারে, যা পরবর্তী সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ।

সামনে কঠিন পথ

সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিবেচনায় নিলে এটি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। এটি অর্জন করতে হলে ডলার ভিত্তিতে গড় প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‌‘বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে হলে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং জ্বালানি সংকট দূর করা অপরিহার্য। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে যেন কোনো ছোট বা বড় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরকারের নিয়মিত সংলাপ বা ডায়ালগ থাকা জরুরি, যাতে তাঁদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা যায়। বিনিয়োগের এই স্থবিরতা কাটাতে হলে সরকারকে দ্রুত কিছু সাহসী সংস্কার ও নীতিসহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শ্রমঘন শিল্প এবং সেবা খাতের বিকাশে জোর দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) সঙ্গে বড় শিল্পের লিংকেজ বা সংযোগ স্থাপন করতে পারলে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও টেকসই প্রযুক্তি গবেষক ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এআইইউবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. হুমায়রা ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, বিগত ১৮ মাস ধরে দেশের সব সেক্টরে এক ধরনের অস্থিরতা ও মন্দা চলেছে। ব্যাংকঋণে সুদের হার অনেক বেশি বিধায় বিনিয়োগ ও পুনর্বিনিয়োগ হচ্ছে না। প্রচুর পোশাক কারখানা ও অন্যান্য অনেক কলকারখানা বন্ধ হওয়াতে বেকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এমনকি অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্টও আইন-শৃঙ্খলার খারাপ অবস্থায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে আসলে ব্যবসায়ীদের দিকে সহায়তার হাত বাড়াতে হবে, কিন্তু তেমন কোনো ইংগিত দেখছি না।