Image description

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত বরাবর বাংলাদেশের জেলাগুলিতে মৌলবাদী ও পাকিস্তান-পন্থী দল জামায়াতে ইসলামির জয়-জয়কারকে আশঙ্কার কারণ হিসেবে দেখছে নয়াদিল্লি। একাধিক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সোমবারই ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে সম্ভাব্য নানাবিধ বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে রিপোর্ট পাঠিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘ঢাকায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির জয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ রইল না পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলির প্রায় ৭০ শতাংশে জামায়াতে ইসলামির বিপুল জয়ে। এই ঘটনা আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তাকে বড়সড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে এবং চোরাচালান, মানবপাচার থেকে সন্ত্রাসবাদ— সব কিছুরই বাড়বাড়ন্তের সহায়ক হবে।’ পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা দ্রুত কঠোরতর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে গোয়েন্দা রিপোর্টে।

 
একইসঙ্গে নজর থাকবে ওপারেও। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে চলা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক ইতিমধ্যেই সব দলকে একসঙ্গে নিয়ে ‘মানবিক’ বাংলাদেশ গড়ার ডাক দিয়েছেন। শপথগ্রহণের আগে জমায়াত-আমিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎও করে এসেছেন। যা নিয়ে আবার দলেরই একাংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন— জামায়াতকে রোখার শর্তেই যেখানে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিএনপি, সেখানে ওদের সঙ্গে কীসের এত সৌজন্যরক্ষার দায়? ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, ছন্নছাড়া ঘর গোছানোর ক্ষেত্রে কিছু বাধ্যবাধকতা থাকবেই। এখন দেখার বিষয়, জামায়াতের এই বাড়বাড়ন্ত ঠেকিয়ে আঞ্চলিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা নেন খালেদা-পুত্র।

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামির বাড়বাড়ন্ত আশঙ্কার কারণ হয়েছে অনেকেরই। এর আগে কখনও ১৮-র বেশি আসন না-পাওয়া জামায়াত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে ৬৮টি আসন জিতেছে। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা-বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাগুলির অধিকাংশ আসনে বিএনপি-কে হারিয়ে জামায়াত প্রার্থীরা জিতেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্মকর্তার কথায়, ‘প্রাথমিক সমীক্ষায় বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে জামায়াতের এই জয়কে আমরা একটি বিশেষ ডিজ়াইন বলে মনে করছি। এমনিতেই সীমান্তবর্তী এ সব এলাকা মাদক, সোনা, জালনোট এবং গোরু চোরাচালানের করিডর। গত ১০ বছরে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের নিরলস পরিশ্রমে গোরু পাচার ও জালনোট ঢোকা বন্ধ করা গিয়েছে। নজরদারি বাড়ানোয় অন্য চোরাচালানের পরিমাণও কমেছে। তবে মানবপাচার বন্ধ করা যায়নি।’ তাঁর আশঙ্কা, সংলগ্ন এলাকায় জামায়াতের জয়ে চোরাচালান আবার ফুলেফেঁপে উঠতে পারে। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন থেকে উত্তরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত এলাকার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করে এসেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতারাই। শেখ হাসিনা যৌথ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে এই এলাকা থেকে জামায়াতের নেটওয়ার্ক উচ্ছেদ করেছিলেন। এখন হাসিনা-জমানা ‘ইতিহাস’। তাই ফের সেই নেটওয়ার্ক সীমান্তের সমান্তরালে গড়ে উঠেছে বলে রিপোর্ট গোয়েন্দাদের।

কী মত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের?

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর অন্য এক কর্তা বলছেন, ‘চোরাচালান থেকে রোজ সিন্ডিকেটের আয় হয় কোটি কোটি টাকা। সেই টাকা জামায়াত বিনিয়োগ করে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির পরিকাঠামো তৈরিতে। জঙ্গিদের ট্রেনিং থেকে শুরু করে তাদের জন্য অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ— সবই হয় চোরাচালানের টাকায়।’ তাঁর সংযোজন, ‘পূর্ব সীমান্ত দিয়ে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ ও নাশকতা ঘটিয়ে ভারতকে দুর্বল করার যে ছক রয়েছে, তার মাথা আসলে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। জামায়াত অতীতেও আইএসআই-এর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগী ভূমিকা নিয়েছে।’ ফের একই আশঙ্কা তৈরি হলো বলে মনে করছেন ওই কর্তা। তবে তাঁর আশা, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্য ও কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনীগুলি দেশের সুরক্ষায় পারস্পরিক সমন্বয় গড়ে তুলবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীও যাতে নজরদারি ও পাহবারায় ঢিলেমি না-দেয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত-লাগোয়া জেলাগুলিতেই কেন এত বাড়বাড়ন্ত জামায়াতের?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলেন— এর পিছনে ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশরা ভারতীয় ভূখণ্ডকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার পরে বাসিন্দাদের অপশন দেয়— পাকিস্তানের হিন্দুরা চাইলে ভারতে এবং ভারতের মুসলিমরা পকিস্তানে যেতে পারেন। এতে কয়েক কোটি হিন্দু পরিবার যেমন পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে ভারতে চলে আসেন, সংখ্যায় কম হলেও কয়েক লক্ষ মুসলিম পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যান। পূর্ব পাকিস্তানে ঢোকার পরে ওই সব পরিবার মূলত সীমান্তের অদূরেই থিতু হন। সীমান্তের কাছাকাছি এলাকার ঘরছাড়া হিন্দুদের খালি বাড়িগুলিই এঁদের জন্য বরাদ্দ করে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুসলিম লিগের সরকার। বাংলাদেশের এক প্রবীণ সাংবাদিকের ব্যাখ্যা— ‘এঁদের সঙ্গে পূর্ব বাংলার শিকড়ের টান নয়, ছিল ধর্মের টান। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এঁরা কখনও যোগ দেননি। ভাষা আন্দোলনেও ভূমিকা নেই। বরং একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই এঁদের কাছে শুধুই পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত!’ ওই সাংবাদিকের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ বরাবরই জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি। আওয়ামি-হীন ভোটে কিছুটা হলেও রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাতেই জামায়াত ফুলে ফেঁপে উঠেছে বলে মত অনেকেরই। তবে জামায়াতের ঝুলিতে পড়া প্রায় ৩২ শতাংশ ভোটের পুরোটাই ‘সীমান্ত-প্রভাবিত’ না-ও হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।