রোজা শুরু হতে বাকি আর মাত্র একদিন। ইতিমধ্যে ইফতারির নানা পণ্য কিনতে শুরু করেছেন ক্রেতারা। এতে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাম হাঁকাহাঁকিতে সরগরম হয়ে উঠেছে বাজার। তবে ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুরের বাজারে ভিড় বাড়লেও চড়া দামের কারণে মুখ ‘কালো’ করে ফিরছেন অনেক ক্রেতাই।
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যের আমদানি আগের তুলনায় বেশি হলেও বাজারে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়তে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি চিনি, ছোলা ও ডালের দামও বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দর ধর্মঘটের কারণে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া এবং নির্বাচনের ছুটিতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও চাহিদার তুলনায় পণ্যের মজুত বেশি রয়েছে বলে জানান তারা।
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা ও খেজুর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শুধু রমজান মাসে সয়াবিন তেলের চাহিদা ৩ লাখ টন। এ ছাড়া চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন, পেঁয়াজ ৫ লাখ টন, ছোলা ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টন এবং খেজুরের চাহিদা ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ৪৭ হাজার টন খেজুর, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, প্রায় ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ১৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে।
সারা বছর কমবেশি খেজুরের চাহিদা থাকলেও রমজান এলে তা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রোজায় খেজুরের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্বাভাবিক রাখতে সরকার শুল্কছাড় দিয়েছে। গত ডিসেম্বরে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এরপর দেশে পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি হয়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারে দাম কমেনি, বরং আগের চেয়ে বেড়েছে।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ইফতারের প্রধান পণ্য খেজুরের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি গরুর মাংস, কয়েক ধরনের মাছ ও আমদানি করা ফলের দামও বেড়েছে। রমজানে শরবত তৈরির জন্য সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে লেবুর। এ ফলটির দাম কয়েক গুণ বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবচেয়ে কম দামে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বাংলা খেজুর। জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা এবং দাবাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি জাহিদি খেজুরের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বাড়লেও খুচরায় দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা।
খুচরায় অন্যান্য খেজুরের মধ্যে বরই ৪৮০ থেকে ৬০০ টাকা, কালমি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মরিয়ম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব খেজুরের দামও খুচরায় ৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে, যেখানে পাইকারিতে বেড়েছে ২০ থেকে ১০০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুল্কছাড় দিলেও তা কার্যকর হতে সময় লেগেছে। এতে তারা তেমন সুবিধা পাননি। এ ছাড়া শেষ মুহূর্তে বন্দর ধর্মঘটের কারণে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া এবং নির্বাচনের ছুটিতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের বছরের তুলনায় এসব পণ্য এবার প্রায় দ্বিগুণ আমদানি হয়েছে। এমনকি ছোলা চাহিদার চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, পাইকারি থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম আরটিএনএনকে বলেন, পাইকারি পর্যায়ে খেজুরের দাম বাড়েনি এবং সরবরাহেও কোনো সংকট নেই।

খেজুরের পাশাপাশি গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় উঠেছে, যা সপ্তাহখানেক আগে প্রায় ৫০ টাকা কম ছিল। রুই, কাতলা, শিং, কই ও পাবদা মাছও কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
রমজানকে সামনে রেখে আমদানি করা ফলের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। আপেল বিক্রি হচ্ছে কেজি ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা, নাশপাতি ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা, কমলা ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা, আনার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং আঙুর ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়। আমদানিকারকদের মতে, প্রতি কেজি বিদেশি ফলে ১২৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত শুল্ক–কর থাকায় বাজারে দাম চড়া।
অন্যদিকে ইফতারের অপরিহার্য পণ্য ছোলা বিক্রি হচ্ছে কেজি ৯০ থেকে ১১০ টাকায়। বুটের ডাল ও খেসারি ডালের দাম তুলনামূলক কম রয়েছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় চিনির দাম প্রায় ১৭ শতাংশ কম। বর্তমানে খোলা চিনি কেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর কাজলার বাসিন্দা নিগার সুলতানা আরটিএনএনকে বলেন, রোজা শুরুর আগেই খেজুর, বরই, লেবুসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে। মাংস ও মাছের দামও বাড়তি।

বায়তুল মোকাররম মার্কেটের খেজুর বিক্রেতা শফিউল্লাহ আরটিএনএনকে বলেন, পাইকারি বাজার থেকে আমরা বেশি দামে কিনছি। তাই কিছুটা বাড়িয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। তবে বাজারে খেজুরের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম আরটিএনএনকে বলেন, পাইকারিতে দাম বাড়েনি। খুচরা বিক্রেতারা বেশি দাম বাড়াচ্ছেন। গত বছরের চেয়ে এবার যে শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে, তা মাত্র ২ শতাংশ বেশি। কিন্তু বাজারদর গত বছরের চেয়ে অনেক কম রয়েছে। তাছাড়া এবার ইরাক থেকে আসা খেজুরের একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে।