ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর এখন দেশবাসীর দৃষ্টি নতুন সংসদ ও সরকার গঠনের দিকে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবারের সংসদ গঠন ও শপথ অনুষ্ঠান প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যাচ্ছে। সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়ে থাকেন। তবে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গত বছরের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার পর থেকে জনসমক্ষে নেই এবং ডেপুটি স্পিকার বর্তমানে কারান্তরীণ রয়েছেন।
যদিও সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী উত্তরসূরি কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার তার পদে বহাল থাকেন, কিন্তু তার অনুপস্থিতি ও অক্ষমতার কারণে এবার বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ পরিচালনা করতে পারেন। এছাড়া গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার শপথ পড়াতে ব্যর্থ হলে বা রাজি না হলে সেই দায়িত্ব প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ওপর বর্তায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয় ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এই শপথ অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হবে।
সংসদ সচিবালয় ইতিমধ্যে শপথ কক্ষ ও দলীয় কক্ষগুলো সংস্কার করে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি কোনো বিকল্প প্রস্তাব দেয়, তবে সরকার তাও বিবেচনায় নেবে বলে জানা গেছে। সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমেই গঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। এরপর শুরু হবে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে রাষ্ট্রপতি যাকে মনে করবেন, তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করায় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে এটি এখন প্রায় নিশ্চিত। নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথের দিন বিকালেই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে এবং এই শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
মন্ত্রিসভার গঠন ও আকারের বিষয়টি পুরোপুরিভাবে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারভুক্ত। প্রধানমন্ত্রী চাইলে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ৩০, ৪০ বা ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারেন। তবে এখানে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই একজন সংসদ সদস্য হতে হবে।
এছাড়া মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যার অন্তত ১০ ভাগের ৯ ভাগ হতে হবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে। বাকি ১০ ভাগের ১ ভাগ সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য নন এমন যোগ্য ব্যক্তিদের ‘টেকনোক্র্যাট’ কোটায় মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকছে। সংসদ সচিবালয় থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার নাম রাষ্ট্রপতিকে জানানোর পরই এই নিয়োগ ও শপথের চূড়ান্ত ক্ষণ নির্ধারিত হবে।
এর আগে বাংলাদেশে সবশেষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালে। সে সময় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তবে ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তেসরা জানুয়ারি বিএনপি আমলের স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের কাছেই শপথ নেয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এর তিন দিন পর ছয়ই জানুয়ারি শপথ নেয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদর কাছে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারির নির্বাচনের পর ৮ই জানুয়ারি গেজেট প্রকাশ হয়। ১০ই জানুয়ারি স্পিকারের শপথ নেন সংসদ সদস্যরা আর ১১ই জানুয়ারি শপথ নেয় মন্ত্রিসভা। এর আগে ২০০১ সালে পহেলা অক্টোবর নির্বাচন হলেও গেজেট হয়েছিল পাঁচই অক্টোবর।
তবে তিনদিন ধরে চলা সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রথমদিনে খালেদা জিয়াসহ চারদলীয় ঐক্যজোটের ১৯৭ জন নির্বাচিত তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদের কাছে শপথ নিয়েছিলেন নয়ই অক্টোবর। পরদিন ১০ই অক্টোবর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে।