Image description

Muhib Khan (মুহিব খান)


২০২০ বা ২১-এর কথা। শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় ও বর্বরতার অন্ধকারে ছেয়ে আছে গোটা দেশ। দেশপ্রেমিক ইসলামপন্থী মানুষেরা ভয়ানক বিপদগ্রস্ত, সন্ত্রস্ত এবং সতর্ক।
হঠাৎ একদিন বিশিষ্ট মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শরীফ মাহমুদ বায়েজিদ ভাই আমাকে ফোন করে বললেন, 'ভাইজান, আমার পরিচিত একজন মুরুব্বী আপনার ভীষণ ভক্ত, তিনি আপনার সঙ্গে একদিন একটু সাক্ষাতে কথা বলতে চান। জানি আপনি ভীষণ ব্যস্ততায় থাকেন, এটা তিনিও জানেন। আপনার প্রোগ্রামের চলাচলের পথে সুবিধামতো একদিন আমার অফিসের দিকে তাসরিফ নিলে আমি আপনাকে তার সঙ্গে সাক্ষাত করাব।' আমি তার কাছে মুরুব্বি মানুষটির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'এখন থাক, সাক্ষাতেই পরিচয় হবে, আপনি তাকে চিনতে পারবেন। এটা সারপ্রাইজের জন্য রইল।'
 
আমি পরবর্তী অনেক দিনের মধ্যে সময় বের করতে পারছিলাম না, একসময় ভুলেই গেলাম। বায়েজিদ ভাই আবারো আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, বললেন, মুরুব্বি মানুষটি আমার সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন।
 
একদিন আমি আমার এক সফরের পথে তাকে জানিয়ে তার অফিসে গেলাম। তিনি আমার সময় নষ্ট না করে খুব দ্রুত আমাকে নিয়ে গেলেন ঢাকার আফতাবনগরে। একটি ভবনের সিঁড়ি বেয়ে উঠে একটি ফ্ল্যাটের দরজায় নক করলেন। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসিমুখে দরজাটি মেলে দাঁড়ালেন স্বয়ং আমীরে জামায়াত ডাঃ শফিকুর রহমান সাহেব। আমি তার কথা আগে ভাবিনি। তাই বেশ পুলকিত হলাম। সময়টা ছিল আসরের আযানের পরপর।
 
আমিরের জামায়াত আমার সঙ্গে সালাম মুসাফাহা মুয়ানাকা কপালে চুম্বন ও আহলান সাহালান জানিয়ে হাত ধরে ভিতরে টেনে নিলেন এবং বৈঠক ঘরের মেঝেতে বিছানো কয়েকটি জায়নামাজের মধ্যে সামনের জায়নামাজে আসরের নামাজের ইমামতির জন্য ঠেলে দিলেন। আমি ইতস্ততঃ করে তাকেই সামনে পাঠাতে চাইলাম। তিনি তার অপূর্ব বিনম্রতা ও স্বভাবসুলভ বদান্যতা প্রকাশ করে বললেন, 'কবি সাহেব, আপনি একজন আলেম, চিন্তা-দর্শনে জাতির পথপ্রদর্শক, উম্মাহর গৌরব, আমরা আপনার ইমামতিতে ধন্য হতে চাই।' তিনি এবং বায়েজিদ ভাই সহ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের তখনকার জামায়াত প্রধান ও আরো দুই একজনকে নিয়ে আসরের নামাজ সমাপ্ত করলাম।
 
তিনি আমাকে তার বেডরুমে নিয়ে গেলেন। বিছানার পাশে একটি ছোট্ট টেবিলকে ঘিরে আমরা বসলাম। সঙ্গে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণের সে সময়ের জামায়াত প্রধান দু'জন ভাইও ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আন্তরিকতাপূর্ণ ভঙ্গিতে উপমহাদেশের ইসলাম ও মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস টেনে ৪৭, ৭১ এবং ২০২০ পর্যন্ত স্মরণ করলেন। মুসলিম বিশ্বের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়েও কথা বললেন। আর বললেন, 'কবি সাহেব, আমি যা বলছি, আপনি এসব আরো ভালোভাবে জানেন, উম্মাহ এবং বাংলাদেশ নিয়ে আপনার চিন্তা চেতনা সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। তাই আপনার কাছ থেকে শুনছি কম, বলছি বেশি, কেননা আপনার মূল্যবান সময়টুক হারাতে চাই না। বাংলাদেশের কওমি এবং আলিয়া ধারাসহ ইসলামপন্থীদের সকল মত ও পথকে এক জায়গায় নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখি এবং সাধ্যমত চেষ্টায় আছি। আলহামদুলিল্লাহ আপনি এই অবস্থানটি নিজেও ধরে রেখেছেন এবং সবাইকে এ আহ্বান বহুদিন ধরেই করে আসছেন। ইসলামী সর্বমহলে আপনার প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা এ কাজে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে।‘
 
সহাস্যে বললেন, ‘বলতে পারেন আমিও আপনার একজন পাগল ভক্ত, এই দুঃসময়ের ভিতর আপনার সঙ্গে একবার সাক্ষাতের জন্য বায়েজিদকে বলে অনেকদিন অপেক্ষায় আছি। আমরা সাধ্যমত হাটহাজারী ওয়ালাদেরসহ কওমি অঙ্গনের প্রধান প্রধান সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিজ থেকে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করছি। আপনাকে আমরা সে তালিকায় ফেলি না। আপনার চিন্তা কথা ব্যক্তিত্ব ও দর্শন ব্যতিক্রম এবং অনন্য সাধারণ। উম্মাহ ও দেশের জন্য আপনার প্রয়োজন। আপনি আপনার নিজের অবস্থান থেকেই অনেক কিছু করছেন, আরও অনেক বেশি করার তৌফিক আল্লাহ আপনাকে দান করুন।'
 
তিনি আরো কিছু বিষয়ে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে বরই জাতীয় আরও দু'একটি দেশি ফল, পিঠা ও চা পর্বে আপ্যায়ন করলেন। আমি বিমুগ্ধ হয়ে তার ভেতরের চেতনা ও দু'চোখের লালিত স্বপ্ন অনুভব করলাম এবং আমার মতো করে কিছু মৌলিক বিশ্লেষণ ও ভাবনা বিনিময় করলাম।
মাগরিবের আর মিনিট বিশেক বাকি। তিনি জানতে চাইলেন, মাগরিবের পরেও আমি সময় দিতে পারবো কিনা বা কতক্ষণ পারব। আমি সবিনয়ে জানালাম, আমার একটি সফর আছে। তিনি অন্যদের পাশের রুমে গিয়ে বসতে বললেন এবং পরবর্তী ১৫-২০ মিনিট একান্তে আমার সঙ্গে আরও কিছু বিষয় শেয়ার করলেন। সবশেষে বললেন, আমরা দুজন ভাইয়ের মত। আমি বুড়ো হয়েছি, তাই বড় ভাই, আর আপনি আমার প্রাণপ্রিয় ছোট ভাই। কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে নয়, অন্তরের মহব্বত থেকে বলছি, আপনার ব্যক্তিগত বা যে কোনো ছোট বড় প্রয়োজনে আপনি আমার নাম্বারে সরাসরি একটি ফোন করবেন মাত্র, আমি আমার সাধ্যের পুরোটা দিয়ে আপনার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। আজকের এই বিশেষ সাক্ষাতের কথা আপনার অনুমতি ছাড়া আমি কাউকে শেয়ার করব না, তবে আপনি চাইলে নিজস্ব বিশ্বস্ত নিরাপদ মানুষদের সাথে শেয়ার করতেও পারেন।'
 
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে বের হলেন। ড্রয়িংরুমে আবারও মাগরিবের জন্য কয়েকটি নামাজ বিছানো হলো এবং তিনি আবারও আমাকে সামনে এগিয়ে দিয়ে দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মাগরিবের জামাতে শরিক হলেন। নামাজ ও দোয়ার পর কপালে চুম্বনসহ যথাযথ সোহাগ ও সম্মানের সাথে আমাকে বিদায় জানালেন।
তার সম্মতি থাকা সত্ত্বেও আমি তার সে সময়কার গতিবিধির গোপনীয়তা ও অবস্থানগত নিরাপত্তা বিবেচনা করে এই সুন্দর গল্পটি নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন সেই সীমাবদ্ধতাটুকু নেই।
 
#
পরবর্তী কয়েক বছরে হৃদ্যতা, সৌজন্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের বাইরে আমি আমার ব্যক্তিগত বা অন্য কোন প্রয়োজনে তার সঙ্গে একটিবারও যোগাযোগ করিনি। তিনিও তার শ্বশুরের মৃত্যু সংবাদ আমাকে মুঠোফোনে প্রেরণ-সহ আন্তরিকতা ধরে রেখেছেন। গত রমজান, ঈদ ও গ্রীষ্মে আমার বাসায় তার বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে শুভেচ্ছাপত্রসহ খেজুর তসবি জায়নামাজ বই-পুস্তক ও মৌসুমী আম প্রীতি উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছেন।
#
মানুষ হিসেবে তিনি বিশেষ ও ব্যতিক্রমী। আন্তরিক ও দরদী। নিরহংকার ও কল্যাণকামী। সমঝদার ও সদাচারী। বিনয়ী ও দৃঢ়-প্রত্যয়ী। স্নেহ ভালোবাসা শ্রদ্ধা ও বদান্যতার অকৃত্রিম দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী।
একটি রাজনৈতিক দল ও আদর্শিক জনগোষ্ঠীর নেতা হিসেবে বিশেষ উপযোগী। তিনি তার রাজনৈতিক মিশনের বিশাল বহরকে নিজস্ব ব্যতিক্রমী চরিত্রমাধুর্য্য ও উপযুক্ত কৌশলে যথেষ্ট এগিয়ে নিতে সক্ষম ও সফল হয়েছেন।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে তার মত-মন্তব্য ও বক্তব্য সুন্দর ও প্রশংসাযোগ্য। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এ সম্মানজনক পরাজয়ের পর ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশের প্রক্রিয়া ঘিরে কারচুপি, কূট-কৌশল, ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিচারিতা এবং সামগ্রিকভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ ও আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি আরও একটি সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর বক্তব্যের দৃষ্টান্ত রেখেছেন। আমার পুরোপুরি মনে নেই তবে তিনি এরকম বলেছেন, 'এ পর্যায়ে আমরা সরকার গঠন করতে না পারলেও মনে করে নেব আমাদের মধ্যে কোন ঘাটতি রয়ে গেছে; যা পূরণ করেই আল্লাহ আমাদেরকে দেশ ও জাতির দায়িত্ব প্রদান করবেন।' তা-ই হোক।
ব্যক্তি হিসেবে তিনি আমার পছন্দের মানুষ। বিশেষ আকর্ষণীয়; একজন অমায়িক রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও।
আল্লাহ তাকে সুস্থ সুদীর্ঘ হায়াত দান করুন।