আনিসুর রহমান
বাংলাদেশ মধ্যপন্থাকেই বেছে নিয়েছে। দেশবাসী ঝুঁকি গ্রহণের পরিবর্তে নিশ্চিত অবস্থানকে নিরাপদ মনে করে দ্ব্যর্থহীন রায় দিয়েছেন। বিএনপিকে ভুমিধ্বস বিজয় উপহার দিয়ে দুই দশক পরে আবার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। দেশবাসীর সামনে দুটো বিকল্প ছিল। একটি ছিল ভালো বা মন্দের অনিশ্চয়তা এবং অন্যটি মাঝামাঝি ভালো কিংবা অন্তত পক্ষে মন্দের ভালোর মোটামুটি নিশ্চয়তা। জনগণ বাস্তবতাকে মেনে অনিশ্চয়তাকে পরিহার করেছেন। তারা ভুল করেছেন কিনা সেটা সামনে বোঝা যাবে। তবে ভোটারদের দ্ব্যর্থহীন রায়কে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন করা গনতন্ত্রের শর্ত।
এবারের নির্বাচনে কে বিজয়ী হবেন তা নিয়ে মতভেদ ছিল। অধিকাংশ বিশ্লেষক বিএনপির বিজয় অনুমান করলেও একটা অংশ জামায়াতের বিজয়ের মাধ্যমে একটা অঘটন ঘটতে পারে বলেও আশা করেছিলেন।
নির্বাচনে যে শেষ পর্যন্ত টান টান উত্তেজনা ও সাসপেন্স টিকে ছিল তার কৃতিত্বটা কিন্তু প্রধানত জামায়াতের। যে জামায়াত অতীতে ১০% ভাগের বেশি ভোট পায়নি এবারের নির্বাচনে তারা বিজয়ী হয়ে যেতে পারে বলেও কিছু মানুষের মনে একটা ধারণা সৃষ্টি করে ফেলেছিল। এক্ষেত্রে তাদের নিবেদিত ডিজিটাল কর্মীবাহিনী বিরাট ভূমিকা রাখে। জামায়াত এইবার তাদের 'ঈমানী ও আদর্শভিত্তিক' চরিত্র দিয়ে অঘটন ঘটিয়ে বিজয়ী হয়ে যাবে, এরকম একটা হাইপ তোলার স্ট্র্যাটেজি নিয়ে তারা অগ্রসর হয়। জামায়াত যেটা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে তা হলো তারা একটি আদর্শবাদী দল যারা নীতি নৈতিকতাকে সবার উপরে স্থান দেয়। অন্যদের নৈতিকতার ভিত ততটা শক্ত নয়। প্রথমদিকে এই হাইপ তুলে অনেকটা এগিয়েও যায়। কিন্তু হাইপটা স্থায়ী হয়নি। বিএনপি এই ডিজিটাল প্রচারণায় একটু বিলম্বে যোগ দিলেও শেষ দিকে জামায়াতের কাছাকাছি চলে আসে। বিএনপি তার জনভিত্তি এবং তৃনমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে জামায়াতের ডিজিটাল প্রচারণার সামান্য এগিয়ে থাকাকে যোজন যোজন ব্যবধানে পেছনে ফেলে দেয়।
জামায়াতের একটা বড় কৌশল ছিল বিএনপিকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং চাঁদাবাজদের একটি দল হিসেবে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি কেউ দুর্নীতি করেনি, এমন দাবি কেউই করেন না, বিএনপির নেতারাও না। পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক দল পৃথিবীতে খুব একটা আছে বলেও মনে হয় না যদিও এটা দুর্নীতির পক্ষে কোনো সাফাই হতে পারে না। বিএনপির সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন, ব্যবসায়ী, ঠিকাদাররা বড় রকমের দুর্নীতি করেছেন বলে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তিলকে তাল করা হয়েছে। দুর্নীতি নিয়ে এবারের বিপত্তির কারণ হচ্ছে, হাসিনা রেজিমের পতনের পর বিশেষ করে মফস্বলে বিএনপির লোকজনদের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হবার ঘটনা। তবে তারেক রহমানের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করায় এর আর বিস্তার ঘটেনি। তারা কার্যকর ভাবে 'ডেমেজ কন্ট্রোল' করতে সক্ষম হন। তবে সরকার গঠনের পরে যদি আবার দুর্নীতি শুরু হয় তাহলে এই দলের প্রতি মানুষ যে নতুন আস্থা স্থাপন করেছে তা নষ্ট হতে বেশি সময় লাগবে না।
জামায়াতের ব্যাপারে দৃশ্যমান বড়রকমের দুর্নীতির তেমন অভিযোগ নেই। তবে জামায়াত কাগজে কলমে না হলেও বাস্তবে দলীয়ভাবে বেশ কিছু ব্যবসাবাণিজ্য চালায় – বিশেষ করে ব্যাংকিং এবং চিকিৎসা খাতে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এইগুলোতে চাকুরিবাকুরিও দেয়া হয় মূলত দলীয় লোকদের। কিন্তু যেহেতু তারা ব্যবসা করেন সকলের সাথে কাজেই এগুলোতে চাকুরি বা নিয়োগ সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত।
সন্দেহ নেই, নির্বাচনে মুখ্য চরিত্র ছিলেন তারেক রহমান। প্রায় দেড় যুগ নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য হলেও দেশের সাথে তার সম্পর্ক ছিল সার্বক্ষণিক। লন্ডনে বসেই তিনি দলটাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেছেন। প্রায় প্রতিদিন তিনি দেশে এবং বিদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে জুমে বা অন্যভাবে ভিডিও কলে মিলিত হতেন। তিনি মফস্বল পর্যায়েও যোগাযোগের একটা কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। এই জন্য দলের কোনো কিছুই তার অগোচরে ছিল না। অতএব দীর্ঘ সময় পরে দেশে ফিরে সবকিছু তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে। ব্যতিক্রম ছিল শুধু মায়ের সাথে তার আবেগঘন সাক্ষাতটা। অন্যথায় দেড় যুগ পরে তার প্রত্যাবর্তনটা হয় অনেকটা 'এলেন, দেখলেন, জয় করলেন'-এর মতো। বিমানবন্দর থেকে সোজা লাখো মানুষের সমাবেশে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে একটা ছোট্ট পরিকল্পনার কথা বললেন। ফ্যামেলি কার্ড দেবার পরিকল্পনা। আপাতত মনে হয় খুবই একটা সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু এটা যে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে তা এখন অনেকেই বুঝতে পারছেন। রেশন কার্ড বা টিসিবির কার্ডের চেয়ে এর পার্থক্য অনেক। এক্ষেত্রে তারেক রহমান তার পিতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেখানো পথই অনুসরণ করছেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাথে বহুল আলোচিত হিজবুল বাহার জাহাজে করে শিক্ষা বা মত বিনিময় সফরে যেতে। তিনি আমাদেরকে বলেছিলেন আপাতত তার 'ছোট' লক্ষ্য হচ্ছে দেশের খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করা। পরে তা তিনগুণ বৃদ্ধি করা কঠিন হবে না। ক্রনিক খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশকে জিয়া তার স্বল্পকালীন শাসন আমলেই খাদ্য শস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়ে অসাধ্য সাধন করেন। তার আমলে এক বছর বাংলাদেশ বিদেশে কিছু চাল রফতানি করতেও সক্ষম হয় যদিও তা ছিল অনেকটা প্রতীকী– আমদানিকারক দেশটির বিশেষ অনুরোধে। তারেক রহমানও ছোট প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করেছেন। তার বৃক্ষরোপণ, খাল খননের মতো আরও কিছু ছোট ছোট পরিকল্পনা আছে যেগুলো একত্রে যোগ হয়ে দেশের চেহারা পাল্টে দিতে পারে।
আমার মতে বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ওয়াদা হচ্ছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। রাতারাতি বা অতি অল্প সময়ে সর্বত্র দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এই দেশ থেকে দুর্নীতির মূল উৎপাটন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই এ ব্যাপারে অনমনীয় লক্ষ্য রাখতে হবে। ঠুঁটো জগন্নাথ দুর্নীতি দমন কমিশনে কোনো কাজ হয়নি। সর্ষেয় ভূত রেখে দুর্নীতি দমন করা যাবে না। একজন শক্ত মেরুদণ্ড সম্পন্ন আপসহীন সৎ ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে একটি পৃথক দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার কথা তারেক রহমান চিন্তা করে দেখতে পারেন।
দুর্নীতি দমনের সাথে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হতে হবে সরকারের প্রাথমিক অগ্রাধিকার। এই দুটো বিষয় নিশ্চিত করা গেলে দেশের বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের ভূমিকা অপরিসীম। বিরোধী দল ছাড়া তো গণতন্ত্রই কল্পনা করা যায় না। এবার আমাদের দেশে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের ভূমিকায় বসছে জামায়াতে ইসলামী, সাথে নতুন দল ও জোটসঙ্গী এনসিপি। জামায়াত সরকার গঠন করে ফেলার অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে বলে হাইপ তোলার চেষ্টা করলেও তা যে বাস্তবসম্মত ছিল না নির্বাচনী রায়ে তা জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে এবারই তারা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল করেছে। সংসদের নিম্নকক্ষে ৭০টির মতো আসন নিশ্চিত করে অনেককে অবাক করে দিয়েছে। এর একটি কারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। না হলে তারা এর অর্ধেক আসনও পেতো কিনা তাতে সংশয় রয়েছে। নারীদের প্রতি জামায়াত নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি, জান্নাতের টিকিট বিক্রির মতো নির্বাচনী প্রচারণা এবং ভারত সম্পর্কে তাদের ধোঁয়াসাচ্ছন্ন অবস্থান অনেকেই ভালোভাবে নেননি। তবে সংসদে একটা উল্লেখযোগ্য আসন পাওয়ায় তা গণতন্ত্রের জন্য ভালো হয়েছে। বিশেষ করে এনসিপির তরুণ তুর্কীরা সংসদকে প্রাণবন্ত এবং সরকারকে আরো জবাবদিহির আওতায় রাখতে পারবেন বলে দেশবাসী আশা করছেন।
এই নির্বাচনের প্রধান প্রাপ্তি হচ্ছে নির্বাসন থেকে নির্বাচন তথা গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা। এর প্রধান কৃতিত্ব জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগ করা ১৪০০ শহীদ, জানবাজি রাখা লাখো তরুণ এবং এর ক্ষেত্রপ্রস্তুতকরা বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলসমূহের সেইসব অযুত রাজনৈতিক নেতাকর্মীর যারা শত নির্যাতনের মুখেও আত্মসমর্পণ না করে পতিত ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন।
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে পরিত্রাতার ভূমিকা রেখেছেন আমাদের অহংকার নোবেল বিজয়ী বিশ্বব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি এবং তার টিমকে দেশবাসী চিরদিন কৃতজ্ঞতার সাথে মনে রাখবে।
একটা আশবাদ রেখে নিবন্ধটা শেষ করা যায়। নির্বাচনের পরে বিজয়ী এবং বিজিত উভয় পক্ষ কাঙ্খিত এবং পরিমিত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। বিএনপি বিজয় মিছিল না করে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও মঠে শুকরিয়া আদায় করেছে। জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিজয়কে মেনে নিয়ে দেশ গঠনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। শুভ যাত্রা অবশ্যই।
লেখক-
সুইডেন প্রবাসী একজন সিনিয়র বাংলাদেশি সাংবাদিক।