বাংলাদেশে এক ধরনের ভূকম্পনীয় পরিবর্তন ঘটেছে। পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত না হলেও এর অনেক দিকই ছিল অদৃশ্য। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। শুক্রবার এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত তারা ২৯৯টির মধ্যে ২১২টি আসনে জয়ী হয়েছে। প্রথম নজরে এই জয় বাংলাদেশের ক্ষত সারিয়ে স্থিতিশীলতার পথে ফেরার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আগে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু এবার নজিরবিহীনভাবে ৭১টি আসন পেয়েছে তারা। তাদের ১১-দলীয় জোটসহ মোট ৭৭টি আসন পেয়েছে। আওয়ামী লীগের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিএনপি’র জয় যৌক্তিক হলেও জামায়াতের এই উত্থান সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে অন্য উপাদানও কাজ করেছে। পাশাপাশি গণভোট অনুমোদিত হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় এমন পরিবর্তন আসবে, যা নতুন নেতৃত্বের পক্ষেও পূর্বানুমান করা কঠিন। সামনে ঝড়ের আভাস আছে।
‘জেন জি’ কীভাবে পিছিয়ে পড়লো: প্রথমত, ‘জেন-জি’ বিপ্লবী ছাত্রনেতারা প্রায় অনুপস্থিত। তারা মাত্র পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছেন এবং ৩০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ছাত্র শাখা জয় পাওয়ার পর ছাত্রনেতাদের পতন স্পষ্ট হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একসময় যাদের বিপ্লবের পরিকল্পনাকারী বলে প্রশংসা করেছিলেন, সেই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়েছে।
কোথাও না কোথাও ভুল হয়েছে। জামায়াত নয়, বরং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এসব ছাত্রদের সম্ভাবনাই ক্ষুণ্ন করেছে। জামায়াত নিজেদের একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। ২৭ বছর বয়সী নাহিদ ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে প্রচারের গুঞ্জনও ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ঢাকা-১১ আসনে জিতলেও সেটুকুই। পুরো প্রক্রিয়ায় ‘ব্যবহার করে ফেলে দেয়া’র গন্ধ রয়েছে, যা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
বিস্মৃত আওয়ামী লীগ: দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির প্রভাব কম ভোটার উপস্থিতিতে স্পষ্ট ধরা পড়েছে। গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ঘাঁটি। সেখানে পুরোপুরি বিএনপি’র জয় হয়েছে। এতে ধারণা হয়, মূলধারার কোনো দলের জয় জামায়াতের উত্থানের চেয়ে গ্রহণযোগ্য, এমন এক ধরনের ‘বোঝাপড়া’ থাকতে পারে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের ভোটারদের বিরুদ্ধে হুমকির খবরও এসেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কেউই এ বিষয়টি তেমন তুলে ধরেননি। বড় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। অথচ আগে নির্বাচন জালিয়াতির অভিযোগে এসব গণমাধ্যমই সরব ছিল। সংক্ষেপে, আওয়ামী লীগের উচিত নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও মাঠপর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা।
জামায়াতের নীরব বিজয়: তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জামায়াতের জয়। এটি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য। ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান ভূমিধস জয় পেয়েছেন বলা হলেও জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪,৩৯৯। সীমান্তবর্তী আসন লালমনিরহাট, নীলফামারী এবং রংপুর অঞ্চলে জামায়াত শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এটি দিল্লির জন্য উদ্বেগজনক। কারণ জামায়াতের অতীত অবস্থান ভারতবিরোধী ছিল এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, যদিও এখন তারা সব প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বের আশ্বাস দিচ্ছে (তালিকায় ভুটানের নামও ছিলÑএকটি বার্তা হিসেবে)। নির্বাচনী প্রচারে ভারতবিরোধিতায় সবচেয়ে সরব ছিল জামায়াত। গণমাধ্যমে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গণভোটে জামায়াত নিঃশর্ত সমর্থন দেয়। এই সংস্কার প্যাকেজ ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন বদলে দেবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে বিরোধীদের ক্ষমতা বাড়াবে। জামায়াত তা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের প্রভাব ভবিষ্যতে আবারো অস্থিরতা তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে। আপাতত তারা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কথা বলবে।
ড. ইউনূসের ভবিষ্যৎ কী?: এবার আসা যাক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গে। গণভোটে থাকা ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের (প্রায় ৭০টি সংবিধান সংশ্লিষ্ট) খসড়া প্রণয়নে তার বড় ভূমিকা ছিল। এত জটিল পরিবর্তন সাধারণ জনগণের সামনে বিশদ ব্যাখ্যা ছাড়াই উপস্থাপন করা প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট আয়োজন গণতন্ত্রে নজিরবিহীন। এ ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সাধারণত সংসদীয় ও আইনগত বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। যদিও বড় দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে, তবুও সময় নির্বাচন সন্দেহ জাগায়। যেমন- সব ভাষাকে বাংলার সমান মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব, যা উর্দুর জন্যও জায়গা করে দেয়; উর্দুর ব্যবহার নির্বাচনী সমাবেশে বেড়েছে।
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের নেতৃত্ব- এসব পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর হাত বাঁধতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি আলোচনায়ও ড. ইউনূস তার এখতিয়ার অতিক্রম করেছেন বলে অভিযোগ আছে। ভারতীয় সুতা বাদ দিয়ে মার্কিন সুতা আমদানির ঘোষণা বাস্তবসম্মত নয়, যেখানে ভারত তার প্রতিবেশী এবং পরিবহন ব্যয় কম।
তার কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, তিনি দ্রুত অবসর নেবেন না; বরং জামায়াতের মতো শক্তিকে পরামর্শ দিয়ে প্রভাব বজায় রাখতে পারেন।
ভারতের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ
বিএনপি’র জয় ভারতের জন্য দ্বিমুখী বাস্তবতা। অতীতে উগ্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগ থাকলেও সময় বদলেছে। ভারতীয় নেতৃত্ব তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। তবে বিএনপি’র সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভারত নয়, জামায়াত। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে তারা পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল; ভারত আমদানি করেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। চীনের ক্ষেত্রে আমদানি ছিল প্রায় ১.১৬ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
২০২৩ সাল থেকে ভারত ও বাংলাদেশ স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমায়। এফএমসিজি, উৎপাদন, ওষুধ ও অবকাঠামো খাতে বহু ভারতীয় কোম্পানি সক্রিয়- যেমন এশিয়ান পেইন্টস, ডাবুর ও টাটা মটরস। দুই অর্থনীতির আন্তঃনির্ভরতা স্পষ্ট। তবে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে ‘নিম্ন-প্রোফাইল’ কূটনীতির মাধ্যমে। কারণ তারেক রহমান ‘ভারতপন্থি’ তকমা এড়াতে চাইবেন। পাকিস্তান সমর্থন প্রদর্শনে সক্রিয় হবে, চীন বিনিয়োগমুখী অবস্থান নেবে।
কূটনৈতিকভাবে ভারতের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছোট প্রতিবেশীর প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন ও প্রয়োজনমতো দ্রুত সহায়তা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সতর্ক দৃষ্টি ও সংবেদনশীল কূটনীতিই হবে মূল চাবিকাঠি।
(লেখক: সাবেক পরিচালক, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সেক্রেটারিয়েট। তার এ লেখাটি অনলাইন এনডিটিভি থেকে অনুবাদ)