Image description

নানা শঙ্কা, জল্পনা-কল্পনার পর হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে প্রথমবারের মতো সংসদের বিরোধী দলে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৬ জন। এর মধ্যে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ৫৯টি আসনেই ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে পাবনা-২ আসনে। যার ভোট পড়ার হার ৮২.৫৮ শতাংশ। আর কম ভোট পড়েছে ঢাকা-১২ আসনে যা ৩৭.৪২ শতাংশ। ৭০ শতাংশের ওপরে ভোট পড়েছে পঞ্চগড়-১ ও ২; ঠাকুরগাঁও-১, ২ ও ৩; দিনাজপুর-১, ২, ৪, ৫ ও ৬; নীলফামারী-২ ও ৩; লালমনিরহাট-১; জয়পুরহাট-১ ও ২; বগুড়া-২, ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭; চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ ও ২; নওগাঁ-১, ২, ৩ ও ৪; রাজশাহী-১, ৩, ৪ ও ৬; নাটের-১, ২, ৩ ও ৪; পাবনা-২, ৩ ও ৪; মেহেরপুর-১; কুষ্টিয়া-২, ৩ ও ৪; চুয়াডাঙ্গা-১ ও ২; ঝিনাহদহ-১, ২, ৩ ও ৪; যশোর-১, ২, ৪, ৫ ও ৬; বাগেরহাট-২ ও ৩; খুলনা-৫ এবং সাতক্ষীরা-১, ২ ও ৩ আসনে ৭০ থেকে ৮২.৫৮ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়েছে। এ ছাড়া ৪০ শতাংশের নিচে ভোট পড়েছে ঢাকা-১২ ও গোপালগঞ্জ-২ আসনে।

গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে যে চিত্র:

এবার নজিরবিহীনভাবে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই তিন আসনে গড়ে ৪৪.৫৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। গোপালগঞ্জ-১ আসনে ৪৯.৭ শতাংশ, গোপালগঞ্জ-২ আসনে ৩৯.৭৮ শতাংশ এবং গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ৪৪.১৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। গোপালগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি’র সেলিমুজ্জামান মোল্যা ৬৮ হাজার ৮৬৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের মো. কাবির মিয়া পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৯৬১ ভোট। গোপালগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির কে এম বাবর ৪০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৩৯ ভোট। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি’র এস এম জিলানী ৬০ হাজার ১৬৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮৬৭ ভোট।

ঢাকার ২০টি আসনের যে চিত্র

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ২০টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, ১৩টি আসনে বিএনপি ও সাতটি আসনে জয়ী হয়েছে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। এর মধ্যে ঢাকা-২০ আসনে সবচেয়ে বেশি ৬৩.৬৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬০.৫৭ শতাংশ ভোট পড়েছে ঢাকা-২ আসনে। আর সর্বোচ্চসংখ্যক প্রার্থীর ঢাকা-১২ আসনে সর্বনিম্ন ৩৭.৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ঢাকা থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে ঢাকা-২ আসনের আমানউল্লাহ আমান এবং ঢাকা-৮ আসনের মির্জা আব্বাস এর আগেও সংসদ সদস্য ছিলেন। কিন্তু অন্য ১৮ জন প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

বড় ব্যবধানে জয়ী যারা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশকিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা গেছে। এসব আসনে খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে। তথ্য বলছে, অন্তত ৫০টি আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে। এর মধ্যে ২১টি আসনে পাঁচ হাজারের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে। তবে বিপরীত চিত্রও আছে। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তুলনায় বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে সংসদে যাচ্ছেন কেউ কেউ। তথ্য বিশ্লেষণ করে কমপক্ষে চারজন প্রার্থী পাওয়া গেছে যারা দেড় লাখেরও বেশি ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন আরও ২৬ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন রাঙ্গামাটির দীপেন দেওয়ান। সংসদীয় আসন ২৯৯-এ বিএনপি’র এই প্রার্থী পেয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা পেয়েছেন ৩১ হাজার ২২২ ভোট। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ৩২২ ভোট বেশি পেয়েছেন দীপেন দেওয়ান। এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখের বেশি। জয়ের ব্যবধানের দিক থেকে এরপরে রয়েছেন রাজবাড়ী-২ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী হারুন-অর-রশিদ। ধানের শীষ প্রতীকে ২ লাখ ৩৭ হাজার ২৫৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জামিল হিজাযী ৬৭ হাজার ২৯৯ ভোট পেয়েছেন। হারুন-অর-রশিদ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৫৫ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এই আসনেও মোট ভোটার ৫ লাখের বেশি। জয়ের ব্যবধানের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন জামালপুর-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৬ হাজার ২১৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. মুজিবুর রহমান আজাদী পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৬১ ভোট। অর্থাৎ এই আসনে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। দেড় লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পাওয়া অপর প্রার্থী হলেন, সাতক্ষীরা-২ আসনের মুহাম্মদ আবদুল খালেক। জামায়াতে ইসলামীর এই প্রার্থী পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র প্রার্থী মো. আবদুর রউফ পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২২৯ ভোট। আবদুল খালেক জিতেছেন ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৩০ ভোটের ব্যবধানে। এ আসনে ভোটার ৫ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি।

কোনো আসনেই জেতেনি ৪১টি দল: নির্বাচনে শতাধিক আসনে প্রার্থী দিয়েও অনেক দল কোনো আসন পায়নি। ছোট রাজনৈতিক দলগুলো জয় পেলেও জাতীয় পার্টির (জাপা) মতো বড় দল ১৯৬ আসনে নির্বাচন করে জয় পায়নি একটি আসনেও। জাপা বাদে আসন না পাওয়া দলগুলো হলো- লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), জাকের পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (আইএফবি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট (আইওজে), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (বিআইএফ), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), বাংলাদেশ কংগ্রেস, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পাটি), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), জনতার দল, আমজনতার দল, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (এম এ মতিন)।

ইসির দেয়া তথ্যমতে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে অংশ নেয় দুই হাজার ২৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন। বাকি ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই প্রার্থীদের মধ্যে পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৯৪৬ জন, যার মধ্যে বিভিন্ন দলের এক হাজার ৬৯২ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫৩ জন। আর নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। যাদের মধ্যে বিভিন্ন দলের ৬৩ জন ও স্বতন্ত্র ২০ জন।