Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা রাত পোহালেই শেষ হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। ফলে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে কোনও প্রার্থী নির্বাচনি প্রচারণা করতে পারবেন না।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ চলবে। এবারের নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসন বাদে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট হচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।

এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। মোট প্রার্থী রয়েছেন ২ হাজার ৩৪ জন, যার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, যারা ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন ২৯১ জন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবং জাতীয় পার্টি ১৯৮ জন প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩২ জন প্রার্থী শাপলা কলি প্রতীকে রয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীকে লড়ছেন।

ভোটার সংখ্যার দিক থেকেও এবারের নির্বাচন বড়। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২২০ জন। সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন এবং সর্বোচ্চ ভোটার গাজীপুর-২ আসনে ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন।

ভোট পরিচালনার প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ থাকবে। নির্বাচনি দায়িত্বে থাকবেন প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন থাকবেন প্রায় ৯ লাখ সদস্য। পর্যবেক্ষণে থাকবেন ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন এবং প্রায় ৫০০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক।

নির্বাচনি প্রচারণার শেষদিন ব্যস্ত সময় পার করেছে বিএনপি-জামায়াত

নির্বাচনি প্রচারণার শেষ দিন রাজধানীতে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাতটি এলাকা এবং নিজের নির্বাচনি এলাকা মিলিয়ে মোট আটটি জনসভায় অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন।

ভাষণে তিনি বলেন, “ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকেই আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবো। আমাদের লড়াই শুধু ক্ষমতা দখলের নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।” তিনি আরও অঙ্গীকার করেন, ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সংবিধান মোতাবেক কাজ করবে এবং শাসকরা নিজেদের মালিক মনে করবে না।

জামায়াত ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমানও দিনব্যাপী প্রচারণা শেষে সন্ধ্যায় বিটিভিতে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে প্রথম দিন ফজর নামাজ পড়েই দেশের কল্যাণে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করবো। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে ‘হ্যাঁ’ বলছি; দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিকে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলছি।”

পুরো নির্বাচনি প্রচারণা জুড়ে ছিল বিষোদগারের প্রতিযোগিতা

প্রার্থীরা দিনভর গণসংযোগ, মিছিল, মিটিং ও সমাবেশে ব্যস্ত ছিলেন। উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে একে অন্যের প্রতি অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগও চলতে থাকে। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচনি প্রচারণায় কুৎসা রটনা, আক্রমণাত্মক বা মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া যাবে না, কিন্তু বেশিরভাগ প্রার্থী তা তোয়াক্কা করেননি।

রাজধানীর আলোচিত আসনের প্রচারণা

ঢাকার ২০টি আসনে ১৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আলোচিত আসনগুলো হলো ঢাকা-৬, ঢাকা-৮, ঢাকা-৯, ঢাকা-১১, ঢাকা-১২, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫ ও ঢাকা-১৭।

ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, ঢাকা-৮ আসনে জামায়াতের ১১ দলীয় জোটের নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী ও বিএনপির মির্জা আব্বাস, ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র ডা. তাসনিম জারা ও বিএনপির হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা-১১ আসনে জামায়াতের ১১ দলীয় জোটের এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও বিএনপির এম এ কাইয়ুম আলোচনায় ছিলেন।

ঢাকা-১২ আসনে তিন সাইফুলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা—বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাইফুল আলম নীরব ও জামায়াতের সাইফুল আলম খান মিলন।

ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপির ববি হাজ্জাজ ও জামায়াতের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির সানজিদা ইসলাম তুলি ও জামায়াতের মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের ডা. শফিকুর রহমান ও বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াত প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান। এই দুই আসনের প্রচারণায় ছিল অন্যরকম আমেজ ও উত্তেজনা।